ঢাকা     সোমবার   ২৫ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪৩৩ || ৮ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভক্তির ছলনে নিয়ত অবজ্ঞা, কে মানে কবির অনুজ্ঞা?

শরীফ আতিক-উজ-জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪১, ২৫ মে ২০২৬  
ভক্তির ছলনে নিয়ত অবজ্ঞা, কে মানে কবির অনুজ্ঞা?

সমাজের ওপর লেখকের সত্যিই কি কোনো প্রভাব আছে? সমাজের মানুষ কি তাদের সুচিন্তাগুলো ধারণ করে? পরিসংখ্যান ও নেতিবাচক তুলনা দিয়ে সবকিছুর ন্যায্যতা যাচাইয়ে যে সমাজ ভীষণ পারদর্শী তাদের দিকে তাকিয়ে সর্বদা এই প্রশ্নগুলো মনের মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকে। ক্রমাগত অধোগতির দিকে ধাবিত প্রজন্ম নির্বিশেষে এ দেশের মানুষের প্রকৃত প্রত্যাশা কী? এই প্রশ্নের উত্তর কি সবটাই রাজনীতির মধ্যে লুকিয়ে আছে, অন্যত্র আমাদের চোখ মেলে দেখার প্রয়োজন নেই? মহান লেখকেরা দীর্ঘকাল ধরে সমাজের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ককে একটি অপরিহার্য মিথোজীবী চুক্তি হিসেবে দেখে এসেছেন। লেখকের দায়িত্ব হলো জনসাধারণকে সচেতন করা, তাদের ভাবনাতাড়িত করা, মনের ক্ষত নিরাময় করা, ইত্যাদি। আর সমাজের দায়িত্ব হলো লেখকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা, ভাবনাগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়া, অনুসরণ বা দ্বিমত পোষণ করা।  

আমেরিকান লেখক ই বি হোয়াইট ‘প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একজন লেখকের কর্তব্য ভালো বা খারাপ হওয়া নয়; সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী হওয়াও নয়; প্রাণবন্ত হওয়া। নীরস বা ভুলে ভরা নয়, বরং নির্ভুল হওয়া।’ তবে লেখকের পক্ষে সবসময় নির্ভুল হওয়া সম্ভব কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও সেটাই লেখকের সাধনার জায়গা। ফরাসি ঔপন্যাসিক আলব্যয়ার কাম্যু নির্ভীকভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, একজন লেখকের উদ্দেশ্য হলো ‘সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা।’ একইভাবে, জন স্টেইনবেক বিশ্বাস করতেন যে লেখকদের অবশ্যই তাঁদের সময়ের বিবেক হিসেবে কাজ করতে হবে। ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস বলেছিলেন, ‘ভালো কথাসাহিত্যের কাজ হলো বিচলিতদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং স্বস্তিতে থাকাদের বিচলিত করা’। আর আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লেখকদের বিচারকের আসনে বসার চেয়ে বোঝাপড়াকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। লেখকদেরকে বাইরে থেকে ভাসা ভাসা না দেখে মানব অভিজ্ঞতার সর্বজনীন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে উৎসাহ যোগাতেন।   

আরো পড়ুন:

এর বিপরীতে লেখকরা যুক্তি দেন যে, তাদের এই গুরুদায়িত্বগুলো পালন করতে হলে সমাজকেও কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হয়। লেখকদের সৃজনশীল কাজের জন্য অবাধ স্বাধীনতা প্রয়োজন। জেমস বোল্ডউইন সমাজের কাছে ‘সবকিছু পুনঃনিরীক্ষা করার পরম স্বাধীনতা’ দাবি করেছিলেন। কিন্তু এই পারস্পরিক বিষয়টি যত সরল মনে হয় আসলে তত সরল নয়। লেখক লেখেন পাঠক পড়বেন সেই প্রত্যাশায়। তাঁরা প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন, নতুন চিন্তাভাবনা, সামাজিক অসঙ্গতি, সমাজের করণীয় ইত্যাদি তুলে ধরেন। জনসাধারণ তাঁদের মন্তব্য খোলামেলাভাবে গ্রহণ করবেন সে প্রত্যাশাও থাকে। র‌্যালফ ওয়াল্ডো এমারসনসহ আরো আধুনিক ব্যক্তিত্বরা গ্রন্থের ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক দালিলিক প্রমাণকে স্বীকার করার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এর অপরিহার্যতা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। 

কবি-সাহিত্যিকদের ‍সৃষ্টির শিক্ষায়তনিক পঠন-পাঠন অনিবার্য চলমান এক বিষয়। তার পাশাপাশি তাঁদের ঘিরে সমাজে গড়ে ওঠা সংগঠন-কেন্দ্রিক চর্চাও অব্যাহত রয়েছে। জন্মদিন উদযাপন ও মৃত্যুদিনে স্মরণ অনেকটা আচার পালনের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাতে কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভটাই বেশি হওয়ার কথা। মানুষের নৈতিকতা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল, সংবেদনশীল ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণই এই চর্চার উদ্দেশ্য। এটি মানুষের ভেতরের সুপ্ত গুণাবলি জাগ্রত করে এবং আদিম প্রবৃত্তি ও কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করে। কিন্তু আমরা যা ভাবি আর যা করি তার মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। 

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের এই দেশকে ‘ভাব-পাগলার দেশ’ বলেছিলেন, যারা শুধু ভাব নিয়ে থাকে, আর মানুষকে শুধু কথায় মাতিয়ে মশগুল করে রাখে, যা তাঁর কাছে মস্ত এক ‘বদ-খেয়াল’ মনে হয়েছে। যিনি ভাবের বাঁশি বাজিয়ে জনগণকে নাচাবেন তিনি নিঃস্বার্থ ত্যাগী-ঋষি না হলে তার কাজে জনস্বার্থ রক্ষিত হয় না। ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে নজরুল সেই কথাটা বলেছেন: ‘ত্যাগী অনেক আছেন দেশে, কিন্তু …তাঁহারা কোনো ভালো কাজে আর কোনো অর্থ দিতে চাহেন না, বা অন্য কোনোরূপ ত্যাগ স্বীকার করিতেও রাজি নন। …তাঁহারা তাঁহাদের চোখের সামনে দেখিতেছেন যে, কত লোকের কত মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ধন দেশের নামে, কল্যাণের নামে আদায় করিয়া বাজে লোকে নিজেদের উদর পূর্ণ করিতেছে। যাঁহারা সত্যিকার দেশকর্মী– সে বেচারা সত্যি কথা স্পষ্টভাবে বলিতে গিয়া এই সব কর্মীদের কারচুপিতে পুয়াল চাপা পড়িয়া গিয়াছে, বেচারারা এখন ভালো বলিতে গেলেও এই সব মুখোশ-পরা ত্যাগী মহাপুরুষগণ হট্টগোল বাধাইয়া লোককে সম্পূর্ণ উলটা বুঝাইয়া দিয়া তাহাকে একদম খেলো, ঝুটা ইত্যাদি প্রমাণ করিয়া দেন। সহজ জনসাধারণের সরল মন এসব না ধরিতে পারার দরুন তাহাদের মন অতি অল্পেই ওই সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষাইয়া উঠে।’ আজকের বাংলাদেশ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। শতবর্ষ আগে রচিত এই প্রবন্ধের বাণী মানুষকে কতটুকু প্রভাবিত করেছে? আগামীতে করবে কি? তারচেয়েও গুরুতর প্রশ্ন হলো, আমরা ক’জন এই প্রবন্ধ পাঠ করেছি? 

সমাজে শ্রেয়োবোধসম্পন্ন মানুষদের নির্দিষ্ট কিছু উদ্বেগ একতাবদ্ধ করে রাখে যার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন একটি। নজরুল সবসময় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বর্তমানের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন প্রবল যা ভোট ও ক্ষমতা লাভের সবচেয়ে সহজ উপায়। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনচর্চার মাধ্যমে সারা জীবন সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ‘হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা’ বা ‘মন্দির ও মসজিদ’-এর মতো লেখায় ধর্মান্ধতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিভেদনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং তরুণ সমাজকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তাঁর লেখায় বরাবরই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পৌরাণিক উপাদানের এক চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যায়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ’ কবিতায় তিনি লিখছেন: ‘মাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ/সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান! ...‘খালেদ’ আবার ধরিয়াছে অসি, ‘অর্জুন’ ছোঁড়ে বাণ/জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান!’ অজেয় মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ ও মহাভারতের অনন্য শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা অর্জুনের অস্ত্র ধারণের উদ্ধৃতি দিয়ে কবি পরাধীন ভারতের মুক্তির জন্য রুখে দাঁড়াতে হিন্দু-মুসলিমের সম্মিলিত সংগ্রাম ও সংহতির কথা বুঝিয়েছেন। কিন্তু আজকের খালেদ-অর্জুনরা আঘাত করার জন্য নিজেদের মাথাই বেছে নিয়েছে। 

কাজী নজরুলকে স্মরণ করে আমরা এসবের প্রতিবাদ করি। ঘাড় ফুলিয়ে, বাবরি দুলিয়ে তাঁর গান-কবিতা উচ্চারণ করে যাই, কিন্তু ভেতরের অন্ধকার ঘোচে কই? আমরা উদযাপন করি, কিন্তু হৃদয়ের উৎকর্ষ সাধিত হয় কই? যেসব অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলি, পরে নিজেরাও অনায়াসে সেই কর্মে প্রবৃত্ত হই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা তখন কেবল নিজস্ব খ্যাতিলাভের অস্ত্র ছাড়া আর কিছু হয়ে ওঠে না। এ সকল চর্চা কি কেবল ব্যক্তিগত খ্যাতির লোভেই হয়ে থাকে?  

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী শ্রমহীন সম্পদ, বিবেকহীন ভোগবিলাস, চরিত্রহীন জ্ঞান, নৈতিকতাহীন বাণিজ্য, মানবতাহীন বিজ্ঞান, ত্যাগহীন উপাসনা ও নীতিহীন রাজনীতি— এই ৭টি বিষয়কে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য অন্তরায় মনে করতেন। কাজী নজরুল মহাত্মা গান্ধীকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। গান্ধীর সঙ্গে তাঁর একাধিকবার দেখা হয়েছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাক্ষাৎটি হয়েছিল ১৯২৫ সালের মে মাসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ফরিদপুর অধিবেশনে। এই সভায় নজরুল গান্ধীর জন্য বেশ কয়েকটি দেশাত্মবোধক গান গেয়েছিলেন, যার মধ্যে চরকা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গানটিও ছিল। যেহেতু গান্ধী বাংলা বুঝতেন না, তাই নজরুলের সহযোগী সুবোধ রায় তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে গানটির একটি ইংরেজি অনুবাদ করে দেন। গানটির গীতিমাধুর্য্য ও সমতার বার্তা গান্ধীকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তবে নজরুল গান্ধীর প্রশংসা ও গঠনমূলক সমালোচনা দুটোই করেছিলেন। ‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ প্রবন্ধে নজরুল মহাত্মা গান্ধীর একটি ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করে বলেছেন যে, গান্ধীজি যেভাবে সমাজের অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষদের ভাই বলে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করেছিলেন, তা ভারতবর্ষে এক অসাধ্য সাধন। নজরুল মনে করতেন, গান্ধীজি দেশবাসীকে নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস বা স্বাবলম্বন শিখিয়েছিলেন, যা স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে নজরুল সমালোচনা করে বলেন, “ভারতবাসী গান্ধীজির আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাস না রেখে, ‘গান্ধীজি আছেন’ বলে তাঁর ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করেছিল।” এই পরাবলম্বনকে নজরুল সাধারণ মানুষের জীবনের ‘সবচেয়ে বড় গোলামি’ বলে মনে করতেন। 

একসময় উপনিবেশ সৃষ্টি হতো ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে। বর্তমানে প্রযুক্তির অত্যাধুনিক বিকাশের ফলে দূর থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে উন্নয়নশীল বা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে পরাশক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শর্তের অধীনে পরিচালিত হতে বাধ্য করে। এই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা, যার ফলে অধীনস্থ শ্রেণিগুলোর উন্নয়ন ও অধিকার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিদেশি শক্তির সমর্থন বা হস্তক্ষেপ কামনা করে। এর ফলে বিদেশি শক্তির কাছে দেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। কিন্তু স্বার্থপর রাজনৈতিক শক্তি তার তোয়াক্কা করে না। এই ‘গোলামী’কে তারা সানন্দে মেনে নেয়। এই পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিটিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে সাম্প্রদায়িক।  

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অবমূল্যায়ন ও অধিকারহীনতাকে নজরুল একটি বড় সংকট হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর লেখনিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা উঠে এসেছে। মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি পুরুষশাসিত সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে নারীদের সম-অধিকার ও মুক্তির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর সাহিত্য ও দর্শনে নারী-পুরুষের সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল সাম্য।   

কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বাণী সমাজে আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত হলেও, বাস্তবে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে তাঁর সামাজিক মূল্যবোধগুলো পুরোপুরি মেনে চলাতো দূরের কথা, বরং অনেক ক্ষেত্রে সমাজ তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। নজরুল তাঁর কবিতায় মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ও শ্রেণি-বৈষম্যের যে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় তা অবমূল্যায়িত হয়ে চলেছে। তিনি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতা মূলনীতি হিসেবে থাকলেও, বাস্তবে প্রায়ই উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটে চলেছে, যা কবির আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক। আজীবন ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও বর্তমান সমাজ তাঁর চিন্তাধারার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। নজরুলের সামাজিক মূল্যবোধগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক লেখালেখি বা বিশেষ দিবসের বক্তৃতাবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে তিনি শুধুই ব্যবহৃত হলেন।   

বিদেশি পণ্ডিত ও সমালোচকেরা নজরুল ইসলামকে বিশ্ব মানবতাবাদের পথিকৃৎ এবং উপনিবেশিক বিরোধী একজন প্রবক্তা হিসেবে দেখেন। উইন্সটন ই ল্যাংলির মতো পাশ্চাত্য সমালোচকরা মনে করেন যে, নজরুল জাতীয়তাবাদের ভৌগোলিক ও আদর্শগত সীমানা ভেঙে দিয়েছিলেন। উপনিবেশবাদ-বিরোধী প্রতিরোধের সঙ্গে ব্যাপকভাবে বিশ্বজনীন মানবতাবাদকে একীভূত করেছিলেন। তিনি উন্নয়নকে নিছক একটি অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে না দেখে, বরং একটি মুক্তিদায়ী সক্ষমতা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। তাঁর ভাবনাসমূহ জাতি, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার পাশ্চাত্য ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে কথা বলেছিল। উইলিয়াম রাদিচের মতো পণ্ডিত সাম্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি নজরুলের অবিচল অঙ্গীকারের ওপর আলোকপাত করেছেন। নজরুলের দর্শন সর্বজনীন প্রেম ও সমন্বয়বাদ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। অনেক গবেষক নজরুলের বিপ্লবী উদ্দীপনার সঙ্গে আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক কবিদের রচনার সাদৃশ্য খুঁজে পান। উভয়েই উপনিবেশ শাসিত স্বদেশীদের ‘শৃঙ্খলিত চিন্তা’কে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তা চেয়েছিলেন, কিন্তু নতুন শৃঙ্খল সেই মুক্তিকে পূর্ণতা দেয় না, বরং কুযুক্তির নতুন আনন্দ খুঁজে পায়। আধুনিক শিক্ষায়তনিক আলোচনায় উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিচয় অনুধাবনের জন্য নজরুলের অবদানকে অপরিহার্য হিসেবে বিশ্লেষণ করা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর রচনা সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য অধ্যয়নের এক ব্যাপক ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে। এই সৃষ্টিকর্ম এমন এক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করে যা যুগকে অতিক্রম করে সর্বজনীন হয়ে ওঠার কথা, কিন্তু আমরা তা হতে দেইনি।  

কবি নজরুলের সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসকে সমাগ্রিকভাবে ব্যবহার করার উদারবাদী সক্ষমতা এদেশের তথাকথিত নজরুলপ্রেমীদেরও নেই। তাই তিনি অদ্ভুত এক সাম্প্রদায়িক জালে আটকা পড়ে যান। প্রকৃত নজরুলকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁকে কেবল ‘ইসলামি কবি’ বা ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে একক পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয় যা তার সামগ্রিক অসাম্প্রদায়িক, উদার ও নৈতিক সাহিত্য দর্শনের পরিপন্থি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী নিজেদের মতাদর্শের পক্ষে প্রমাণ করতে নজরুলের লেখা থেকে সুবিধাজনক অংশ ব্যবহার করে থাকে, আর এই খণ্ডিত চর্চা এক ধরনের হত্যাকাণ্ডের সাথে তুলনীয়। এর মাঝ দিয়ে ঐক্য নয়, বিভেদের চর্চা জিইয়ে থাকে। 

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়