Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৬ ১৪২৮ ||  ০৬ জিলক্বদ ১৪৪২

মানুষ মানুষের জন‌্য... 

মাহমুদুল হাসান মিলন, ময়মনসিংহ   || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৩, ৫ মে ২০২১  
মানুষ মানুষের জন‌্য... 

‘মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ফ্রি হাট

মানুষই সংশয়-সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। মানুষই মানুষের জন‌্য কাজ করে। আর অসচ্ছলদের পাশে সাহায‌্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে সচ্ছল মানুষরাই। কখনো একা, কখনো সম্মিলিতভাবে। তেমনই এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ময়মনসিংহের ‘মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশন’। রোজায় অসহায়-হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়ায় নিত‌্য প্রয়োজনীয় পণ‌্য নিয়ে। তবে, সংগঠনটি সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেয় না। তারা  ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়িতে  আয়োজন করে ‘ফ্রি হাট’। এই হাট থেকে অসচ্ছলরা নিজ নিজ প্রয়োজনীয় পণ‌্য বিনামূল‌্যে নিয়ে যায়।

অন‌্যান‌্য বারের মতো এবারও সংগঠনটি আয়োজন করে এই হাটের। গত ১৪ এপ্রিল শুরু হওয়া এই ফ্রি হাট শেষ হলো ৫ মে (বুধবার)।

আয়োজকরা জানান, মাসব্যাপী হাটের প্রথম দিন থেকে ৫০০ জন করে এই পর্যন্ত মোট ২ হাজার পরিবারকে সরাসরি কৃষক থেকে সংগ্রহ করা টাটকা লাউ, মিষ্টি কুমড়া, আলু, টমেটো, মাছ ও সৌদি আরব থেকে আনা খেজুর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, শিশুদের জন্য ছিল ঘুড়ি ও বেলুনসহ নানা রকমের খেলনার স্টল। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিশুদের মানসিক আনন্দ দিতে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের উপহার তুলে দেওয়া হয়।

সংগঠনের সদস্যদের চাঁদা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের দেওয়া অর্থে ফ্রি হাট কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে।

রমজানের ফ্রি হাট শেষ হলেও পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আরও দুটি ঈদের ফ্রি হাট চালু করা বলে জানিয়েছেন এই হাটের সমন্বয়ক আজহারুল ইসলাম পলাশ। তিনি বলেন, ‘যেখানে থাকবে অসহায় ও আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুদের জন্য নতুন জামা কাপড়, ঈদের দিনে রান্নাবান্নার জন্য সেমাই, চিনি, চাল, ডালসহ  প্রয়োজন‌্য পণ‌্য। ’

আজহারুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘গত বছর রোজায় আমাদের এই ফ্রি হাট কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় এই বছরও গত প্রথম রোজায় এই কর্মসূচি চালু করা হয়। করোনা ও বৈরী আবহাওয়ায় বোরো ধান নষ্ট হওয়ায়  সামর্থ‌্যহীন পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশন।’

ফ্রি হাট কর্মসূচির সংগঠক অনিক কুমার নন্দী বলেন, ‘কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রথমদিন থেকে বিনামূল্যে বাজার পরিচালনা করা হয়েছে। মফস্বলে হলেও হাটের প্রবেশ পথে রাখা হয়েছিল ইনফ্রারেড থার্মোমিটার, ছিল হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও। স্বেচ্ছাসেবী ও গ্রহীতাদের প্রত্যেকেই মাস্ক ও গ্লাভস পরেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্টল সাজানো হয়েছে ৩ ফুট দূরত্বে। থরে থরে সাজানো ছিল সবজি।’

নন্দী আরও বলেন, ‘আমরা ইচ্ছে করলে বাড়ি বাড়ি সহযোগিতা পৌঁছে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা চেয়েছি, সহযোগিতার পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষদের স্বাস্থ্যবিধি মানাটা হাতে-কলমে শেখাতে। করোনার মধ্যেও কিভাবে হাট পরিচালনা করা যায়, সেই উদাহরণটাই আসলে আমরা দেখিয়েছি। যেন লকডাউন ছাড়াও সাধারণ মানুষ এই মহামারীকে মোকাবিলা করতে শেখে। তবে, যারা হাটে এসে প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে লজ্জা বোধ করেছেন, তাদের বাড়িতে লোকচক্ষুর আড়ালে  পৌঁছে দিয়েছি।’ 

ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়া সহিলাটি গ্রামের লোকমান হোসেন বলেন, ‘একমাত্র ভরসা ছিল বোরো ধান। সেই ফসল নষ্ট হওয়ায় চোখে অন্ধকার দেখছি। প্রথম রোজায় বাজার সদাই করিনি। এই সংগঠনের ছেলেরা অনুরোধ করে পয়সা ছাড়া খুব ভালো মাছ, সবজি, আর খেজুর দিছে। যা দিয়ে দুই-তিন দিন খেয়ে রোজা রাখতে পারবো। এত ভালো বাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না। তারা বাজার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবসময় মুখে মাস্ক পরে থাকতে আর বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুতেও বলছেন।’

হামিদা বেগম বলেন, ‘গত বছর রোজায়ও টাকা ছাড়া বাজার করে অনেক দিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলছি। এই বছরও অনেক সবজি ও মাছ দিয়েছে টাকা ছাড়া। এসব দিয়ে আমাদের কয়েকদিন চলে যাবে। ছেলেদের এমন কাজ খুব ভালা লাগছে।’ 

জেলা জনউদ্যোগ-এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, ‘একটা সময় আমাদের সমাজের যুবকরা ভিন্ন পথে ধাবিত হতো। শুনে খুব খারাপ লাগতো। এখন যুবকরা দেশের খারাপ সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাবারের নিশ্চিয়তা করছে। এর চেয়ে আর ভালো কী হতে পারে? এসব দেখে অন্য যুবকরাও উৎসাহিত হবে। তাদের এমন উদ্যোগে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

গত ১৪ এপ্রিল ভার্চুয়ালি ফ্রি হাট কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। তিনি বলেন, ‘আত্মশুদ্ধির মাস রমজানে এই ধরনের কর্মকাণ্ড আত্মতুষ্টি জোগায়। আসন্ন ঈদে এই কর্মসূচির মাধ্যমে সহস্রাধিক ক্রয়সামর্থহীন পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের নতুন জামা কাপড় দেওয়া হবে।’

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি মানবিক উদ্যোগ। যারা এই উদ‌্যোগ নিয়েছেন, তারা ধন্যবাদ পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। এমন সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহযোগিতা করার চেয়ে আর উত্তম নেয়ামত কী হতে পারে? ফ্রি হাট কর্মসূচি পরিচালনা করতে উপজেলা প্রশাসনও তাদের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে।’

/এনই/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়