Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৯ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ৩ ১৪২৮ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভিক্ষা করে সংসার চলে শতবর্ষী হকার সৈয়দ আহম্মদের

জাহাঙ্গীর লিটন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২০, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১২:২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
ভিক্ষা করে সংসার চলে শতবর্ষী হকার সৈয়দ আহম্মদের

শতবর্ষী সৈয়দ আহম্মদ

লক্ষীপুর পৌরসভার বাঞ্চানগর গ্রামের শতবর্ষী সৈয়দ আহম্মদ ৫ বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার ৬ ছেলে ও মেয়েরাও ষাটোর্ধ্ব বয়সী।

তার এক ছেলে আবুল কালাম (৬০) বাবার পেশা পত্রিকা বিক্রি ধরে রেখেছেন। কিন্ত বর্তমান দ্রব‌্য মূল‌্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে পত্রিকা বিক্রির পয়সায় তারও সংসার চলে না। অন্য ছেলেদের কোনোভাবে সংসার চললেও ষাট বছর বয়সী স্বামী পরিত্যক্ত দুই মেয়ে আর শতবর্ষী স্ত্রীসহ চারজনের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে পথে নামতে হয় তাকে। কিন্তু বয়সের ভারে কোনো কঠিন পেশা তিনি করতে পারেন না জন‌্য ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে এখন জীবন চালাচ্ছেন তিনি।

জানা যায়, একশত বার বছর বয়সী সৈয়দ আহম্মেদ একসময় লক্ষীপুরের পথে ঘাটে পত্রিকা নিয়ে হাজির হতেন মানুষের ধারে। স্থানীয়ভাবে সৈয়দ হকার নামে এ ব্যক্তিটি জীবনের আশিটি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন পত্রিকা বিক্রি করে।

এদিকে, স্থানীয় পত্রিকা সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশে সবচেয়ে আদি পত্রিকা বিক্রেতা সৈয়দ আহম্মেদ। তবে এখন ভিক্ষাবৃত্তিই তার পেশা। লাঠিতে ভর করে লক্ষীপুর শহরে ঘুরে বেড়ান জীবিকার সন্ধানে। চোখে ঠিকমতো না দেখলেও তিন বেলা আহারের খোঁজে প্রতিদিনই বের হয় পথে ঘাটে। পুরোনো পত্রিকার গ্রাহকরা তাকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেন।

সৈয়দ আহমেদ ছিলেন কাগজ কলমে অশিক্ষিত কিন্ত তার হৃদয় ছিল আলোকিত। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে চরম দুঃখ কষ্টে। তবুও হৃদয়বান এ মানুষটি শিশুদের পাঠশালার জন্য দান করেছেন পৌরসভার চার শতক জমি। আর মুসল্লিদের জন্য দিয়েছেন মসজিদের জায়গা।

শতবর্ষী সৈয়দ আহম্মদ জানান, বয়স প্রায় ১শ ১২ বছরের কাছাকাছি। এ বয়সে ভিক্ষার ঝুলি বহন করতে আর পারছেন না। কর্মজীবনের শুরুতে প্রথমে নৌকায় কাজ করতেন। এর পর স্থানীয় এক মাওলানার সহযোগিতায় প্রায় ৮৫ বছর আগে পত্রিকা বিক্রির কাজ শুরু করেন তিনি। সাল-তারিখটা ঠিক মনে করতে পারছিলেন না। তবে ইংরেজ আমলে ভারতীয় পয়গাম পত্রিকা বিক্রি করেছেন। পরে আজাদ, ইত্তেফাক, যুগশঙ্খ আর সংবাদ পত্রিকা বিক্রি করতেন। দুই পয়সা, চার পয়সায় পত্রিকা বিক্রি শুরু করেছিলেন তিনি।

সৈয়দ আহম্মদ আরও জানান, সে সময়ে লক্ষীপুরে সরাসরি পত্রিকা আসতো না। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে রেলগাড়িতে পত্রিকা আসতো। সেখান থেকে বাসে করে লক্ষীপুরে পত্রিকা নিয়ে আসতাম। তারপর তা পাঠকের হাতে পৌঁছে যেত প্রকাশের তিন-চার দিন পরে। প্রতিদিন পত্রিকা পৌঁছে দেয়াও সম্ভব হতো না।

তিনি আরও জানান, কিছু সময় ডাকহরকররা পায়ে হেঁটে পত্রিকা পৌঁছে দিতেন। তখনও সকালবেলার পত্রিকা  আসতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। সন্ধ্যার সময় পত্রিকা বিক্রির জন্য বের হতেন তিনি। এভাবে নিজের অজান্তেই পত্রিকার সঙ্গে নিজের জীবনকে পুরো জড়িয়ে নেন সৈয়দ আহমদ। তার পর টানা প্রায় ৮০ বছর পত্রিকা বিক্রির সঙ্গেই ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত কয়েক বছর থেকে আর পত্রিকা বিক্রি করতে পারছেন না। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে পত্রিকা ছেড়ে ভিক্ষার ঝুলি হাতে নেন।

অতীতের প্রসঙ্গ তুলতেই সৈয়দ আহমেদ ভূইঁয়া জানান, এ পত্রিকা বিক্রিকালেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০-এর গণ-আন্দোলনসহ সব ঐতিহাসিক আন্দোলন দেখেছেন। এসকল ঘটনার স্বাক্ষী তিনি।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতায় নিজের আর স্ত্রীর বয়স্কভাতা ভাতার কার্ড করিয়েছেন। দুটি কার্ডের অর্থ ও শতবর্ষী বৃদ্ধ সৈয়দ আহম্মদের ভিক্ষার টাকা দিয়ে কোনোরকম সংসার চলছে।

পত্রিকা এজেন্ট মেসার্স রহমানিয়া প্রেসের পরিচালক রাকিব হোসেন জানান, ছোট বেলা থেকে দেখতাম প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে রহমানিয়া প্রেসে চলে আসতেন সৈয়দ চাচা। মাঝে মাঝে সকালবেলা দোকান খুলতে এসে দেখতাম সৈয়দ কাকা বসে আছেন। প্রায় সময়ই তিনি আমাদের আগেই এসে বসে থাকতেন। অনেক সময় রাত পর্যন্তও তিনি পত্রিকা বিক্রি করতেন। পত্রিকার গাড়ি এসে পৌঁছালেই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। শুরু হয় যেতো তাঁর কাজ। কাজের সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হতো না। বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তিতেই সংসার চালাচ্ছেন। বিষয়টা দুঃখজনক।

লক্ষীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি হোসাইন আহম্মদ হেলাল জানান, বর্তমান লক্ষীপুর জেলার পূর্বের লক্ষীপুর থানার সব সময়ের হাজার ঘটনার স্বাক্ষী ছিলেন খবরের ফেরিওয়ালা সৈয়দ আহম্মদ। পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। বাম হাতে একটি লাঠি আর কাঁধে ব্যাগ, পরনে পুরোনো বিবর্ণ শার্ট, লুঙ্গি ডান হাতে পত্রিকা  নিয়ে ঘুরে ফিরতেন অলিগলি। কখনো কখনো লক্ষীপুর শহরের পুলের উপরে বসেও পত্রিকা বিক্রি করতেন তিনি। কিন্ত তার কাঁধে ঝোলানো আছে সে ব্যাগ আর পরনে পুরোনো বিবর্ণ শার্ট, লুঙ্গি ও ডান হাতে লাঠি ও আছে। কিন্ত নেই শুধু পত্রিকা। এখন তার সময় যাচ্ছে কষ্টে। এসময় সমাজের বিত্তবানদের হকার সৈয়দ আহাম্মদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান তিনি।

লক্ষীপুর/সারা/বুলাকী

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ