ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

অর্ধকোটি টাকা লোপাট, বিএমডিএর ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা

রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৩২, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩  
অর্ধকোটি টাকা লোপাট, বিএমডিএর ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরমধ্যে দুই কর্মকর্তা ১৮০টি চেক টেম্পারিং করে তুলে নিয়েছেন প্রায় ৩৮ লাখ টাকা।

২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিএমডিএর রাজশাহীর গোদাগাড়ী জোন-২ এর কার্যালয়ে সরকারী অর্থ লুটপাট করার এই উৎসব চলেছে। এ নিয়ে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলার আসামিরা হলেন- গোদাগাড়ী জোন-২ এর তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ খাবির উদ্দিন (৪৫) এবং একই কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রকৌশলী জিএফএম হাসনুল ইসলাম (৫৫)। হাসানুল এখন বিএমডিএর রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় কর্মরত আছেন। খাবির উদ্দিন গোদাগাড়ী থেকে নওগাঁর মান্দায় বদলি হয়েছিলেন। সেখানে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন।

এ দুজনের বিরুদ্ধে ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭১৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া শুধু খাবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। আরেক মামলায় বিএমডিএর মতিউর রহমান (৫০) নামে সাময়িক বরখাস্ত থাকা এক সহকারী হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে ১ লাখ ২১ হাজার ৩২২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

বুধবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা তিনটি দায়ের হয়েছে। এই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আমির হোসাইন বাদী হয়ে মামলাগুলো করেছেন। দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

খাবির ও হাসনুলের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, হাসনুল গোদাগাড়ীতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন আয়-ব্যয় কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি বিল ভাউচারা পাশ, চেক ইস্যু এবং কর্তৃপক্ষের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন কোষাধ্যক্ষ খাবির উদ্দিন। তিনি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ক্যাশ বই সংরক্ষণ, আয়-ব্যয়ের হিসাব লিপিবদ্ধকরণ, চেক প্রস্তুত ও লিপিবদ্ধকরণ, চেক রেজিস্টারে চেকের তথ্য রেকর্ডভুক্তকরণ ও সংরক্ষণ এবং ইস্যু করা চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

তারা দুজনে চেক টেম্পারিং করে সরকারী অর্থ লোপাট করেছেন, এমন অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক গতবছর বিভিন্ন নথিপত্র জব্দ করে। চেকের কপি ও মুড়ি বই পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাবির উদ্দিন ব্যাংক থেকে টাকা তোলার জন্য চেকে এবং চেকের মুড়িতে সমপরিমাণ টাকার অংক লিপিবদ্ধ করে আয়-ব্যয় কর্মকর্তার স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। কিন্তু খাবির উদ্দিন ব্যাংকে চেকগুলো দেওয়ার আগে সুকৌশলে টাকার অংক পরিবর্তন করে নিতেন। এভাবে বেশি টাকা তুলতেন। চেক পর্যালোচনায় দেখা যায়, চেকের মুড়ি অনুযায়ী টাকার অংক লেখার সময় বাম পাশে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রেখে আয়-ব্যয় কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিতেন তিনি। পরবর্তীতে ইচ্ছামাফিক টাকার অংক পরিবর্তন করে নিতেন।

এ প্রক্রিয়ায় ১৮০টি চেকে টাকার অংক কাটাকাটি বা ওভার রাইটিংয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন করে টাকার অংক বৃদ্ধি করে তোলা হয়েছে। ওই ১৮০টি চেকে প্রকৃতপক্ষে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৪ টাকা তোলা যেত। কিন্তু টাকার অংক ও কথায় পরিবর্তন করে তোলা হয়েছে ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ১৫২ টাকা। খাবির উদ্দিন ও জিএফএম হাসনুল ইসলাম যোগসাজোশ করেই বিভিন্ন খাতের বিপরীতে অতিরিক্ত ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭১৮ টাকা তুলেছেন।

এদিকে শুধু খাবিরের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গোদাগাড়ী জোন-২ এ কর্মরত থাকাকালীন তিনি ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোবাইল ভেন্ডিং ইউনিটের (এমভিইউ) রিচার্জেও বিপরীতে ডিলারদের প্রাপ্য কমিশনের ওপর আদায় করা আয়কর ও ভ্যাট বাবদ ১০ লাখ ৮৮ হাজার ২৪৮ টাকা এবং মানি রশিদ বইমূলে আদায় করা ৫০ হাজার ৮৭০ টাকাসহ মোট ১১ লাখ ৩৯ লাখ ১১৮ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া তিনি এসব রশিদ বই গায়েব করেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

তৃতীয় মামলার আসামি মতিউর রহমানও গোদাগাড়ী জোন-২ এ সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি এমভিইউ রিচার্জের বিপরীতে ডিলারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত কমিশনের ওপর প্রযোজ্য আয়কর ও ভ্যাটের অর্থ রশিদ মূলে আদায় করে বিএমডিএ এর সংশ্লিষ্ট খাতে জমা দেননি। এভাবে তিনি ১ লাখ ২১ হাজার ৩২২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

মামলার বিষয়ে কথা বলতে বিএমডিএর সাময়িক বরখাস্ত থাকা কোষাধ্যক্ষ খাবির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। চেক টেম্পারিংয়ের দুটি মামলায় খাবিরের সঙ্গে আসামি থাকা মোহনপুর উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী জিএফএম হাসনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তো যথাযথভাবে চেক সই করতাম। সেই চেক নিয়ে যদি কেউ টেম্পারিং করে, তাহলে এর দায় তার এবং ব্যাংকের। এ জন্য আমি কোনভাবেই দায়ী নই। মামলা হয়েছে কি না তাও আমি জানি না।’

মামলার বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত থাকা সহকারী হিসাবরক্ষক মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ১ লাখ ২১ হাজার ৩২২ টাকা আত্মসাতের আনা হয়েছে তা ৪৪টি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে। এর অভ্যন্তরীণ ও বাণিজ্যিক অডিটও সম্পন্ন হয়েছে। আমি চক্রান্তের শিকার।’
 

কেয়া/বকুল 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়