ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

কুমিল্লায় সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি এলপি গ্যাসের বাজার 

রুবেল মজুমদার  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২৭, ১৫ মার্চ ২০২৩   আপডেট: ১৪:০৩, ১৫ মার্চ ২০২৩
কুমিল্লায় সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি এলপি গ্যাসের বাজার 

কুমিল্লায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে এলপি গ্যাসের স্থানীয় বাজার। খুচরো ব্যবসায়ীরা তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। ফলে সাধারণ ক্রেতারা সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে বেশি মূল্য দিয়ে খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এলপি গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। 

কুমিল্লার বেশ কয়েকজন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, মন্ত্রীর শ্যালক ও মণিমুক্ত পাল নামে এক ব্যবসায়ী কুমিল্লার সব গ্যাস কোম্পানির ডিলারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। যে কারণে ডিলাররা কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করতে পারছেন না। 

বাজার ঘুরে দেখা গেছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১৭০-২৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে এলপি গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। ১২ কেজি গ্যাসের একটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৬ টাকা কমিয়েছে সরকার। কিন্তু আগের দামের চেয়েও অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনছেন সাধারণ ক্রেতা। 

এ প্রসঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, তারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কিনছেন। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিবেশকরা যদি সরকারের নিয়ম না মানে তাহলে তাদের কিছু করার নেই বলেও জানান তারা।  

সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে ১২ কেজির এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৪৯৮ টাকা। যা পরে ৭৬ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৪২২ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু কুমিল্লার কোথাও এই দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না। কিছু বিক্রেতা দাম কমানোর নোটিশ জারির পর গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। শুক্রবার (১০ মার্চ) নগরীর বিভিন্ন এলাকার গ্যাস বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

একই দিন বিকালে সরেজমিনে নগরীর রানীর বাজার এলাকায় সিলিন্ডার হাউসে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। কিন্তু দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি। দোকান মালিক সোহেল মিয়া বলেন, সরকারের দামের সঙ্গে ডিও মেলে না। সরকার নির্ধারিত দামের অনেক বেশি দিয়ে আমাদের কিনতে হয়। এছাড়া আমাদের একটা রেট দিয়ে দেয় পরিবেশকরা। আমরা সেভাবেই বিক্রি করি। 

নগরীর অশোকতলায় মের্সাস ভাই ভাই স্টোরের মালিক মনির হোসেন বলেন, পাইকারি কিনতেই সিলিন্ডারের দাম পড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা ১৬০০ টাকায় বিক্রি করেন। এর নিচে সিলিন্ডার বিক্রি করলে খুচরা ব্যবসায়ীদের কোনো লাভ হবে না। দিনে ৪-৫টি সিলিন্ডার বিক্রি করি। দেড় হাজার টাকা বিনিয়োগ করে যদি ৫০ টাকা লাভ করতে না পারি তাহলে ব্যবসা করে লাভ কি? হতাশ কণ্ঠে প্রশ্ন করেন মনির হোসেন। 

নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাসেল মিয়া বলেন, ৭ জনের পরিবারের জন্য মাসে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার লাগে দেড়টা। গত মাসেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনেছি। দাম বাড়ালে তারা সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর করে। কিন্তু সরকার যখন দাম কমিয়েছে তখন দোকানদাররা বলছে- আগের দামে কেনা। জনগণ তাদের কাছে জিম্মি। 

কুমিল্লা এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের অন্যতম ডিলার মেসার্স উজ্জ্বল টেক্সস-এর মণিমুক্ত পাল বলেন, ‘দাম কমার পর থেকে আমরা ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস ১ হাজার ৪১০ থেকে ১ হাজার ৪২০ টাকায় বিক্রি করছি। কেউ আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে নিলে ১ হাজার ৪০০ টাকা আর আমরা পৌঁছে দিলে ১ হাজার ৪২০ টাকা রাখছি। তবে অন্যরা পাইকারি বাজারে বেশি রাখছে। ফলে প্রতি সিলিন্ডার আমাদের ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছু করার নাই। এটি বড় বড় কোম্পানির বিষয়। আমাদের যে দাম বলে আমরা সেই দামে বিক্রি করি।’ 

জেএমআই এলপিজি গ্যাসের কুমিল্লার ডিলার খোকন বলেন, ‘গ্রাহক পর্যায়ে যেখানে ১৪২২ টাকায় বিক্রি করার কথা, সেখানে আমরা ডিও করছি ১৫০০ টাকা। এরপর গ্যাস আনতে পরিবহন খরচ আছে। নিজস্ব পরিবহনে পাইকারি দোকানে পৌঁছানোর খরচের সঙ্গে সিলিন্ডার প্রতি লাভ ধরি ১০ টাকা। এতে একটি সিলিন্ডারের দাম হয় ১৫৫০ টাকা। যেহেতু আমরা কোম্পানি থেকে কমিশন পাই, তাই সব বাদ দিয়ে ১৫০০ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম হয়ে যায় ১৬০০ থেকে ১৬৫০ টাকা। এখানে আমাদের কারসাজি কোথায়?’ 

‘কোম্পানিকে আগে কম দামে গ্যাস দিতে হবে। তাহলে আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব।’ বলেন খোকন। 

কুমিল্লা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, কোনো ভোক্তা যদি আমাদের অভিযোগ করে আমরা আইন অনুসারে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব বিইআরসির।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ শামীম আলম বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হয়। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কমেছে। বাজারে সেই দামে বিক্রি হচ্ছে না বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। শিগগিরই অভিযান শুরু হবে।

সরকার নির্ধারিত মূল্যে ক্রেতা যেন গ্যাস কিনতে পারেন এ জন্য ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কয়েকবার বৈঠক হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়