গোপলগঞ্জের সংগ্রামী পাঁচ মা
সড়কে শেষ, চিতাতে ছাই
বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকের বাড়ি গ্রামে পাঁচ নারীর জন্য পাঁচটি চিতা তৈরি করা হয়, এই হলো তার একটি। ছবি: রাইজিংবিডি।
অভাব-অনটন ও দুর্বিপাকে পড়ার ভিন্ন ভিন্ন কষ্টের বাস্তবতায় সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার মধ্যবয়সি পাঁচ নারীকে। সেজন্য তাদের বেছে নিতে হয়েছিল দিনমজুরির কাজ। সামান্য আয় দিয়ে কোনো রকমে চালছিল জীবনের চাকা। একদিন সুখ ধরা দেবে ভেবে দুবেলা খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটার সঙ্গে ছোট ছোট স্বপ্নও দেখেতেন এই পাঁচজন মা।
তবে সেই স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার আগেই পিচঢালা সড়কে সমাপ্ত হলো শ্রমক্লান্ত স্বপ্নভরা জীবনগুলো। শ্মশানে চিতার আগুনে শেষবিদায়ের মধ্য দিয়ে তাদের স্বপ্নও পুড়ে ছাই হয়ে গেল। সেই সঙ্গে হতাশার মেঘে ঢাকা পড়েছে তাদের পরিবার।
বাবা-হারা লিজা বিশ্বাস পড়ছেন নার্সিংয়ে। তার স্বপ্ন ছিল নার্স হয়ে টানাটানির সংসারে মা কামনা বিশ্বাসকে দেবেন একটু সুখের ছোঁয়া। সড়ক দুর্ঘটনায় মাকে হারিয়ে বিলাপ করছেন লিজা, বলছেন, “ভাগবান তুমি কি আমাকে চোখে দেখোনি!”
দুই বছর আগে স্বামী পঙ্কজ বিশ্বাসকে হারিয়ে সংসারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কামনা বিশ্বাস। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই করে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন আর মেজ মেয়েকে নার্সিংয়ে এবং ছোট মেয়েকে পড়াচ্ছিলেন একটি বিদ্যালয়ে।
মায়ের আঁচল ধরে চলা সাত বছরের আদরের ছেলেকে লেখাপড়ার জন্য খুলনার একটি খ্রিস্টান মিশনারি হোমে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছিল অভাবের যাঁতায় পিষ্ট কামনা বিশ্বাসকে।
শুধু কামনা বিশ্বাসই নন, জীবনযুদ্ধে সংসারের হাল ধরতে দিনমজুরের পেশা বেছে নিতে হয়েছিল বাকি চার নারীকেও। কামনার মতোই বাড়ি ফেরার পথে সড়কে শেষ হয়ে যায় তাদের জীবনযাত্রা, পাঁচ বাড়িতে ফেরে পাঁচ মায়ের নিষ্প্রাণ দেহ।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদরের ঘটকচরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ইজিবাইককে চাপা দিয়ে খাদে পড়ে যায় একটি বাস। এই দুর্ঘটনায় নিভে যায় সাতটি প্রাণপ্রদীপ, যারা জ্বেলে রেখেছিলেন তাদের সংসারের দীপশিখা।
নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচ নারী শ্রমিকের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকের বাড়ি গ্রামে। রবিবার রাতেই তাদের মরদেহ বাড়িতে আসার পর স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস।
পাইকের বাড়ি গ্রামের শ্রমিক আভা বাড়ৈ, বয়স ৫৪ বছর। স্বামী প্রকাশ বাড়ৈ স্থানীয় টিটি উচ্চ বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরীর কাজ করতেন। চার বছর আগে অসুস্থ হওয়ায় কাজটি ছেড়ে দিতে হয় প্রকাশ বাড়ৈকে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে ভারতে চলে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় আভা বাড়ৈকে। ফলে শ্রমিকের কাজ বেছে নিতে হয় তাকে।
প্রতিদিনের মতো রবিবার ভোরে কাজের উদ্দেশে মাদারীপুর যান আভা। তবে কাজ শেষে স্বপ্নভরা চোখে বাড়ি ফেরার পথটি থমকে যায় মাদীপুরের ঘটকচরে, বাড়ি ফেরে তার লাশ।
আভা বাড়ৈ ও কামনা বিশ্বাসের মতো সংসার চালাতেন নিহত অন্য তিন নারীও। তাদেরও বাড়ি ফেরার পথ থমকে যায় মাদারীপুরে, ফেরে তাদের লাশ।
এই ঘটনায় নিহত বাকি দুজনের বাড়ি মাদীরপুরে, যার মধ্যে ইজিবাইক চালক সাগর বেপারিও অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তান নিয়ে সংসারের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন। এক বাসের জন্য শেষ হয়ে যায় এই সাত প্রাণপ্রদীপ। বাসটি ইজিবাইককে চাপা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়।
কোটালীপাড়ার পাইকের বাড়ি গ্রামের আর যে তিন নারী ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, তারা হলেন: পলাশ বাড়ৈর ৪২ বছর বয়সি স্ত্রী দুলালী বাড়ৈ, জয়ন্ত বাড়ৈর ৫৩ বছরের স্ত্রী অমিতা বাড়ৈ, রঞ্জিত বাড়ৈর ৪৫ বছর বয়সি স্ত্রী শেফালী বাড়ৈ।
মাদারীপুরের সড়কে নিহত গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকের বাড়ি গ্রামের এক নারীর পরিবারে মাতম। রাইজিংবিডির তোলা সোমবারের ছবি।
শুধু নিহত নারীদের পরিবারই নয়, এক সঙ্গে পাঁচজনের জীবন শেষের এই ঘটনা কাঁদায় পুরো পাইক বাড়ি গ্রামকে। এই পাঁচ নারীর জীবন সংগ্রামের বর্ণনা পাওয়া যায় অনেকের কাছে।
পাইকের বাড়ি গ্রামের কলেজ ছাত্রী পান্না বাড়ৈ জানান, রবিবার ভোরে তাদের গ্রামের পাঁচ নারী দিনমজুরের কাজ করতে মাদারীপুরে যান। কাজ শেষে ইজিবাইকে ফিরছিলেন তারা। একটি বাসের চাপায় তারা সবাই নিহত হন।
একই গ্রামের গৃহিণী কাজল বাড়ৈ। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আমাদের এলাকার অনেকেই দিনমজুরের কাজ করতে মাদারীপুরে যান। রবিবার ভোরে দুলালী, অমিতা, আভা, শেফালী ও কামনা কাজ করতে গিয়ে ফেরার পথে নিহত হন। আমরা এলাকাবাসী নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।”
সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমর চাঁদ মৃধা খোকন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। নিহতদের মরদেহ রাতেই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় শ্মশানে নিহতদের মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। তাদের পরিবারে মাতম চলছে।”
নিহত পাঁচ নারীর পরিবারপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব পরিবারের খোঁজ নিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
সুখের সোনার হরিণ ধরার যে স্বপ্ন ছিল এই পাঁচ নারী শ্রমিকের চোখে, চিতার আগুনে সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল নিমেষে।
ঢাকা/রাসেল