সিলেটে বিএনপি-জামায়াতের টার্গেট তরুণ ভোটার
সিলেট সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ছয়টি আসনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন নতুন ও তরুণ ভোটাররা। জীবনের প্রথম ভোটে সৎ, উদ্যমী ও উন্নয়নবান্ধব জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে চান তারা। তরুণ ভোটারদের এই চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচারে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন প্রার্থীরাও।
সিলেটের সবগুলো আসনই গুরুত্বপূর্ণ হলেও সিলেট-১ আসনকে বিশেষ মর্যাদার আসন হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত ধারণায় রয়েছে, এই আসনে যে দলের প্রার্থী জয়ী হন, সেই দলই সরকার গঠন করে। অতীতেও এমন নজির রয়েছে।
ভোটাররা জানান, সিলেট-১ আসনে এবার মূলত তিনজন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তারা হলেন- বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা হাবিবুর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান।
প্রতিদিনই প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। সিলেটের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি, বারবার বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব এবং শিল্পকারখানার অভাব এসব বিষয় প্রচারে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রার্থীরা বলছেন, কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক শিক্ষিত তরুণ দেশ ছাড়ছেন, যা সিলেটের বড় ক্ষতি।
সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল মাজিদ বলেন, “প্রতিদিনই প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। আমাদের কাছে আসছেন, ভোট চাইছেন। মোটামুটি সব প্রার্থীরাই আশ্বাস দিচ্ছেন আগামী সরকার তরুণদের প্রাধান্য দেবে। আমরাও চাই, যে সরকারই আসুক আমাদের মতো তরুণ সমাজকে নিয়ে কাজ করবে।”
সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকার তরুণ ভোটার রায়হান আহমেদ বলেন, “একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করি। উন্নয়ন যেন কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নাগরিক সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়া প্রার্থীকেই আমি ভোট দিতে আগ্রহী।”
শাহপরান সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। দুর্নীতি ও সহিংসতার রাজনীতি পরিহার করে যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি। যিনি তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এলাকার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন, তার পক্ষেই আমার ভোট।”
তরুণ প্রজন্ম নিয়েই কাজ করতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে সিলেট-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “তরুণরাই আমাদের সব। আমার নির্বাচনি এলাকায় তরুণদের নিয়ে কাজ করার বিরাট স্বপ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে বিদেশমুখি হওয়ার প্রবনতা কমিয়ে আনতে আমাদের সরকার ও দল দুটোই কাজ করবে।”
তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ উল্লেখ করে একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, “ফ্যাসিবাদ দূর করেছে এই তরুণরা। আমাদের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ। এই তরুণরা স্বৈরাচার শাসনের পুনরাবৃত্তি হোক আর চায় না। সেজন্য আমি বিশ্বাস করি, তরুণদের বড় অংশ আমাদের ভোট দেবে, কারণ তারা পরিবর্তনের বাংলাদেশ দেখতে চায়।”
সিলেট-৪ আসনেও জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচার। পর্যটনসমৃদ্ধ এই আসনে জাফলং ও সাদা পাথর এলাকায় লুটপাট এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং জামায়াত প্রার্থী জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আরিফুল হক চৌধুরী বহিরাগত প্রার্থী হলেও তার রাজনৈতিক পরিচিতি বড় শক্তি। অন্যদিকে জয়নাল আবেদিন এই এলাকার সন্তান হওয়ায় স্থানীয় সমর্থনে কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এখানে ফল নির্ধারণ করবেন তরুণদের ভোট।
সিলেট-৪ আসনের তরুণ ভোটার জয় তালুকদার বলেন, “নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবার গতবারের তুলনায় প্রায় দুই লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন, যাদের বড় অংশই তরুণ। তরুণ ভোটাররা কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সিলেট গড়ার প্রতিশ্রুতি চাইছেন। প্রার্থীরাও এসব ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন।”
সোমবার নির্বাচনি সভায় সিলেট-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে এই তরুণ সমাজকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। আজ শিক্ষিত যুবকরা চাকরি পাচ্ছে না, মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা হতাশায় ভুগছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি আরো বলেন, “ভোটের মাধ্যমে তরুণদেরই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের রাজনীতি নয়, আমরা চাই গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা। তরুণ ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণই পারে একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।”
ঢাকা/রাহাত/মাসুদ