‘এ যে কি ভয়ংকর কষ্ট তা আমি-আপনি বুঝতে পারব না’
রাহুল ব্যানার্জি, সন্দীপ্তা সেন
ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জির মৃত্যু সকলের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তার মৃত্যু কেউই মানতে পারছেন না। রাহুলের বাড়ি ঘুরে এসে বন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সন্দীপ্তা সেন।
অন্য সকলের মতো সন্দীপ্তাও প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তার ভাষায়—“এতগুলো দিন কেটে গেল, এখনো ঠিক মেনে নিতেই পারছি না, রাহুল আর নেই। রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জি—অত্যন্ত ভালো মানুষ, বন্ধু, গুণী অভিনেতা, সহ-অভিনেতা, লেখক, কবি; এইরকম একজন মানুষকে আমরা হারালাম। রাহুলের খুব প্রিয় একটা লাইন ছিল চন্দ্রবিন্দুর—‘আমরা কমতি পড়লে লোন দিই জন্মদিন’। প্রিয় লাইন যে এইভাবে সত্যি হয়ে যাবে, সেটা ভাবতেই পারিনি।”
প্রত্যেকে গভীরভাবে শোকাহত, খুব কাছের মানুষ চলে গেলে যে দুঃখটা হয়, এটা ঠিক সেই অনুভূতি আর এই মনখারাপের শুধু শুরু আছে, শেষ নেই বলেও জানান সন্দীপ্তা।
কিছুদিন আগেও রাহুলের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বিজয়গড়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন সন্দীপ্তা। তা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “সব থেকে বেশি কষ্ট হয় পরিবারের সদস্যদের, কাছের মানুষদের। সেদিন কাকিমার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম। কত পুরোনো কথা, কত পুরোনো স্মৃতি, রাহুলের ছোটবেলার কথা, পছন্দের খাবার, বই, মায়ের সাথে কাটানো পুরোনো সময়গুলোর কথা, কত কিছু নিয়ে কথা হলো!”
রাহুলের ঘর, নতুন জিম সেটআপ, রাহুলের বই, পোস্টারের কালেকশন সবকিছু রাহুলের অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। কুট্টুসের সঙ্গে দেখা হয়েছে সন্দীপ্তার, এত বছর পরও সন্দীপ্তাকে চিনতে পেরেছে সে। সন্দীপ্তা বলেন, “ওর কষ্টটা বোধহয় সবচেয়ে বেশি। কারণ কাউকে তো বলতেও পারছে না বেচারা!”
রাহুল মারা গেছেন, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তার মা। এ নিয়ে সন্দীপ্তা বলেন, “কাকিমা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, আদরের বাবিনকে (রাহুলের ডাক নাম) হারিয়েছেন তিনি। খুব কষ্ট হচ্ছে, দাদার কথা, বউরাণীর কথা, রাহুলের স্কুলের বন্ধুদের কথা, আত্মীয়দের কথা, বাবলু দার কথা, সহজের কথা আর অবশ্যই প্রিয়াঙ্কার কথা ভেবে। এ যে কি ভয়ংকর কষ্ট সেটা আমি-আপনি বুঝতে পারব না। ছোট্ট সহজ, মাত্র ১৩ বছর বয়সে বন্ধু-বাবাকে হারালো, এইটা বোঝা বা বোঝানোর ভাষা আমার কাছে নেই। আর প্রিয়াঙ্কা নিজের মন শক্ত রেখে, এই অবস্থাতে একা হাতে মিডিয়া, পরিবার, কাজ সবটা সামলাচ্ছে।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের আচরণ নিয়ে সন্দীপ্তা বলেন, “এরকম একটা সময়ে, এত খারাপ লাগার মধ্যে, আরো কষ্ট হয় যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখি। সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষ যদি একটু সেন্সেবল হয়, সব বিষয়ে জাজ না করে, একটু নিরপেক্ষভাবে নিজেদের কষ্ট-যাপন করে, তাহলে মনে হয় আর কেউ না থাকুক, রাহুলের পরিবার, একটু ভালো, একটু শান্তিতে, একটু আড়ালে, নিজেদের মতো করে থাকতে পারে।”
প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সন্দীপ্তা বলেন, “আমরা তো প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা মানুষ, আলাদা আলাদা পার্সোনালিটি। আমাদের দুঃখ প্রকাশের ধরণও আলাদা আলাদা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘটে চলা এই অস্বাভাবিক শুনানি, ভার্ডিক্ট, মাত্র ১৩ বছর বয়সি একটা বাচ্চা ছেলের সমাজ সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করতে পারে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখছি? একটু বোঝার চেষ্টা আমাদের সবাইকেই করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে আমাদের তো একটু সংবেদনশীল, একটু পরিণত হতে হবে।”
রাহুলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে সন্দীপ্তা বলেন, “তবে এটাও সত্যি, গাফিলতি তো হয়েছেই, প্রপার, নিরপেক্ষ ইনভেস্টিগেশন দরকার। গাফিলতি ছাড়া তো এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে না। এখন শুধু সত্যিটা সামনে আসার অপেক্ষা। এই অপেক্ষার মাঝেই আমাদেরকে খুঁজে নিতে হবে, একটু ভালো থাকা। রাহুল তো নিজেই ভালো থাকার প্রতি বেশি ঝুঁকে থাকত। কারুর কাছে সে রাহুল, কারুর কাছে অরুণোদয়, বাবিন, অরুণ। ভালো থাকুক রাহুল, তুমি মনে থাকবে চিরকাল।”
ঢাকা/শান্ত
২৪ ঘণ্টায় হামে আরো ৩ মৃত্যু, আক্রান্ত ৯৪৭