পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা কী পূরণ হবে?
এনাম আহমেদ, বগুড়া || রাইজিংবিডি.কম
ছবির কোলাজ
দিন কয়েক পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনের হাওয়া বইছে। সর্বত্র কী হয়, কী হয় অবস্থা! এসবের মধ্যে আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন ভাগ্যকে মানিয়ে নেয়া সমাজের বড় একটি অংশের মানুষের প্রত্যাশা; যারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার। মূলধারার বাইরে জীবনযাপন করছেন। বলছি, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিজড়া, হরিজন, আর রবিদাস জনগোষ্ঠীর মানুষের কথা।
পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর চোখ এখন আটকে আছে নির্বাচন পরবর্তী সরকারের দিকে। তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন মূলধারায় যুক্ত হতে পারেন, তাদের জীবনমান উন্নয়ন হয়—এমনই প্রত্যাশা তাদের। রাইজিংবিডির এ প্রতিবেদক বগুড়া শহরের হরিজন, হিজড়া আর মুচি জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে এনেছেন।
বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি এলাকায় বসবাস করেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর বেশ কিছু সদস্য। বগুড়া-৬ (সদর) আসনে মোট হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভোটার সংখ্যা ১০ জন। কথা হয় তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার প্রীতির সঙ্গে। তিনি বলেন, “প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেব। বিগত সময়ে যারা সরকারে ছিলেন তারা আমাদের নিয়ে ভাবেননি। আমাদের নিয়ে সংসদে কোনো কথা বলেননি। আমাদের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা করে দেয়নি। আমাদের কর্মস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।”
একগুচ্ছ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রীতি বলেন, “সমাজে সম্মান নিয়ে যেন আমরা চলাফেরা করতে পারি, সে রকম কোনো ব্যবস্থা তারা করেননি। যদি আমাদের নিয়ে ভাবতেন তাহলে আমাদের এরকম মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো না। অসম্মানের জীবনযাপন করতে হতো না। আমি চাই, যে সরকার আসবে, তারা আমাদের নিয়ে ভাববেন। আমাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেবেন। আমাদের কর্মের ব্যবস্থা করবেন। আমি সে রকম একটি সরকার চাই।”
এই জনগোষ্ঠীর সদস্য গুরুমা সুমির সঙ্গে কথা হয়েছে। এর আগে নারীদের কাতারে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন তিনি। এতে কোনো সমস্যা বোধ করেননি। অভিজ্ঞতা জানিয়ে গুরুমা সুমি বলেন, “বাংলাদেশে অনেক সরকার দেখলাম। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিও দেখেছি। প্রার্থীরা আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসতেছেন। আমরা তাদের বলছি, ভোট দেব। আমরা চাই, বাংলাদেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হোক। মানুষ নিরাপদে জীবনযাপন করুক।”
বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে দোকান পেতে জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করেন মিলন। তার বাবা লাল চানও এই স্থানে বসে একই কাজ করতেন। বাবার হাত ধরেই খুবই কম বয়সে আদি পেশায় এসেছেন মিলনও। সমাজে পিছিয়ে পড়া মুচি জনগোষ্ঠীর এই সদস্য বলেন, “আমি যাকে ভোট দেব, তিনিই যেন জয়লাভ করেন। নির্বাচিতরা যেন সাধারণ মানুষের চিন্তা করেন। এর আগের সরকারের মতো যেন অনিয়ম-দুর্নীতি অর্থপাচার না হয়। তারা যেন মানুষের চিন্তা করেন।”
এবারই প্রথম ভোট দেবেন হরিজন জনগোষ্ঠীর সুজন বাসফোঁড়। নাগরিক অধিকারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের জাত আলাদা হতে পারে। কিন্তু আমরা তো মানুষ। সমাজে সাধারণ নাগরিকদের অধিকার রয়েছে, তারা যে সুবিধা ভোগ করছেন, আমাদেরও সেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমরা সেই সুবিধা ভোগ করতে পারছি না। আমরা সবদিক থেকেই বঞ্চিত। আমরা চাই, নতুন যারা সরকার গঠন করবেন, তারা যেন আমাদের এই বিষয়গুলো দেখেন।”
সুজন বাসফোঁড়ের কথার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একই দাবি জানান শ্রীমতি নন্দিনী কুমারীও। তিনি বলেন, “আমাদের চাকরি আমরা করতে পারছি না। সেখানে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে সাধারণ মানুষদের চাকরি দেয়া হয়েছে। আমি ভোট দেব। আমার দাবি, যারাই সরকার গঠন করুন তারা যেন আমাদের কাজের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।”
বগুড়ার ঠনঠনিয়া হরিজন কলোনির সভাপতি দীলিপ বাসফোঁড়। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আমরা সমাজের মানুষের কাছে যেন অচ্ছুত! আমাদের হোটেলে মানুষ খাবার খায় না। বাইরের কেউ আমাদের চিনতে পারলে, কাছে ঘেঁষতে চায় না, আমাদের বাসস্থানের সংকট। আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করলেও সমাজের মূলধারায় কাজকর্ম পায় না।”
নতুন যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে দীলিপ বাসফোঁড় বলেন, “পরিচ্ছন্নকর্মীর চাকরি করব সেখানেও সমস্যা। আমরা তাহলে কোথায় যাব? অতীতের সরকারের মতো নতুন যারা সরকার গঠন করবেন, তারা যেন নিজেদের জীবনমান নিয়ে ব্যস্ত না থাকেন। তারা যেন দেশের উন্নয়ন করেন। সমাজের মানুষদের উন্নয়ন করেন। হরিজন সমাজের জীবনমান উন্নয়নের দিকে নজর দেন।”
ঢাকা/শান্ত