গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থি দল ঠেকাতে বিএনপিতে ভোট দিয়েছে জনগণ
বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
সেলিমুজ্জামান মোল্যা, ডা. কে এম বাবর এবং এস এম জিলানী।
গোপালগঞ্জ জেলাকে আওয়ামী লীগের দুর্গ বলা হয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে সেখানে বিএনপি প্রার্থীরা জামানত হারাতেন। সেই দুর্গে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। জেলার তিনটিই আসনই দখল করেছে বিএনপি। এর আগে, ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে মাত্র একবার বিএনপির এফ ই শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন।
এবারের নির্বাচনে জেলায় ইসলামপন্থি দলের উত্থান ঠেকানোর পাশাপশি নির্দোষ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে রেহায় পেতে এবং একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় এমন ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বিএনপির প্রার্থীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমনই মনে করছেন।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে ভোট কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকতে দুপুরের পর থেকে ভোটাররা কেন্দ্রে যান। এবারের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৬ জন। এরমধ্যে বৈধ ভোট হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৪টি, আর বাতিল হয়েছে ১৪ হাজার ৯৫২টি। জেলায় মোট ভোট পড়েছে ৪৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এ দিকে জেলায় ‘না’ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন ভোটারা। জেলায় মোট ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৬টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬টি।
গোপালগঞ্জ-১ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৮২১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৯ জন। মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫১০ জন। এ আসনে ১৩৮ কেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপি মনোনীত সেলিমুজ্জামান মোল্যা ৭১ হাজার ৫৭৯ ভোট পেয়ে বেসরকারীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৬৪ ভোট। এ আসনে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৯ জন। বাতিল হেয়েছে ৬ হাজার ৪৬৮ ভোট। প্রদত্ত ভোটের হার ৪৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
গোপালগঞ্জ-০২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৩২৪ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬২ জন পুরুষ ভোটার ও নারী ভোটার ১ লাখ ৯০ হাজার ২৫৮ জন। এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. কে এম বাবর ৪০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এইচ খান মঞ্জু পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। বাংলাদেশ খোলফত মজলিসের প্রার্থী শুয়াইব ইবরাহীম পেয়েছেন ২৮ হাজার ৬০৪ ভোট। অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভূঁইয়া পেয়েছেন ২৭ হাজার ৮৯১ ভোট। এ আসনে সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মফিজ ২১৫ ভোট। এই আসনে ভোট পড়েছে ৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
গোপালগঞ্জ-০৩ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৮ জন। এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এম জিলানী ৬০ হাজার ৯৯১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৩৯ ভোট। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আব্দুল আজিজ পেয়েছেন ২৫ হাজার ১৫৩ ভোট। এ আসনে সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি পেয়েছেন ২৬৯ ভোট। এ আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ৪৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
এ তিনটি আসনে একাধিক বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছিল, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে হারতে পারেন বিএনপি প্রার্থীরা। তবে এ সকল স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে না পারায় বিএনপি প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেননি। হেরেছেন বিপুল ভোটের ব্যবধান।
গোপালগঞ্জে গণভোটে এগিয়ে রয়েছে ‘না’ ভোট। গোপালগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে ৩৯৭টি কেন্দ্রের ফলাফলে দেখা গেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট পিছিয়ে আছে। আর ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে। গোপালগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোট পড়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯৬টি। এর মধ্যে বৈধ ভোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ১ ভোট। ‘না’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮টি। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ৭১৬টি। বাতিল হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮ ভোট।
গোপালগঞ্জ-০২ আসনে মোট ভোট পড়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৮৯টি। বৈধ ভোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯২টি। এর মধ্যে ‘না’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০টি। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৩৪ হাজার ৩০২টি। বাতিল হয়েছে ১১ হাজার ২৯৭টি।
গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩৮টি। এর মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৮টি। এর মধ্যে ‘না’ ভোট ৯২ হাজার ৯৭৮টি। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৩৪ হাজার। বাতিল হয়েছে ৯ হাজার ৪৬০ ভোট।
বিএনপির এমন ঐতিহাসিক জয়ে নানা ব্যাখ্যা করছে সাধারণ ভোটাররা। তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাজাকার ও ইসলামপন্থি দল ঠেকানোর ঘোষণা দেওয়ায় এ জেলার ভোটাররা বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। কারণ এ জেলায় শায়িত রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার আদর্শের কারণে জামায়াত ও তার জোট শরীকদের ঠেকাতে বিএনপির ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে ভোটাররা।
তবে অনেক ভোটার বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই এনসিপির গোপালগঞ্জের সমাবেশে হুংকার এবং মামলা-হামলার কারণে বিএনপি প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন ভোটাররা। সেই সঙ্গে বিএনপি প্রার্থীরাও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ও বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হলে আওয়ামী লীগের নির্দোষ নেতাকর্মীরা মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে মুক্ত থাকবে। সেই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করার কারণে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন।
ভোটারা বলছেন, গণভোটে পরিবর্তের যে সব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, এর সঙ্গে অনেক কারণের সঙ্গে ভোটারদের মতের মিল নেই। যে কারণে এখানকার ভোটাররা ‘না’ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
সুশানের জন্য নাগরিক (সুজন) এর গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রবীন্দ্র নাথ অধিকারী বলেন, জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী শক্তি ঠেকাতে গোপালগঞ্জের ভোটাররা বিএনপির প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন। কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি দল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অক্ষুন্ন রাখতেই ভোটাররা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, হামলা ও মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে আওয়ামী ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। যাতে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না পারলেও অন্তত বাড়িঘরে পরিবারের সঙ্গে রাত কাটাতে পারবে এমনটা বুঝে ভোট দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, এ জেলার নারী ভোটাররাও বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন। কারণ ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় গেলে নারীদের অধিকার ক্ষুন্ন হতো এসনটাই ভেবে নারী ভোটাররাও বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
জেলা রিটানিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আরিফ-উজ-জামান বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন। জেলার তিনটি আসনে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে বলে তিনি জানান।
ঢাকা/বাদল/বকুল