আবহাওয়া সতর্কতায় আমের ফলনে বাম্পারের আশা
কক্সবাজার প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
গত বছর অনিয়মিত বৃষ্টি ও অকাল তাপপ্রবাহে কক্সবাজার-এর অনেক আমচাষি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস না পাওয়ায় মুকুল ঝরে যাওয়া, পোকার আক্রমণ ও ফলন কমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তবে চলতি মৌসুমে চিত্র ভিন্ন। আগেভাগে আবহাওয়া তথ্য জেনে পরিকল্পিত পরিচর্যা করায় গাছে গাছে দেখা যাচ্ছে সুস্থ ও বেশি মুকুল। এতে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন চাষীরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ১ হাজার ৪৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৬৫ মেট্রিকটন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত আবহাওয়া পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে মাঠপর্যায়ে চাষীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় বা অকালবৃষ্টির সতর্কবার্তা মোবাইল বার্তা ও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের কাছে।
রামুর আমবাগান মালিক কফিল উদ্দিন বলেন, “গত বছর আবহাওয়া না বুঝে স্প্রে ও সেচ দেওয়ায় টানা বৃষ্টিতে অনেক মুকুল নষ্ট হয়। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিবেচনায় কীটনাশক ও পরিচর্যা করায় মুকুল ভালো এসেছে।”
পেকুয়ার সৈয়দুল ইসলাম জানান, আগে থেকেই সম্ভাব্য তাপপ্রবাহের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী জৈব সার ও সময়মতো স্প্রে প্রয়োগ করায় গত বছরের তুলনায় এবার মুকুলের পরিমাণ বেশি।”
উখিয়ার চাষি ইবনে আমিন বলেন, “এখন নিয়মিত আবহাওয়ার খবর দেখে সেচ ও ওষুধ প্রয়োগ করছেন। এতে মুকুল ঝরে পড়া অনেকটাই কমেছে।”
টেকনাফের বাহারছড়ার আম ব্যবসায়ী ছালামত উল্লাহর ভাষ্য, চাষীরা আবহাওয়া বুঝে পরিচর্যা করলে ফলন যেমন ভালো হয়, তেমনি বাজারে মানসম্মত আমও পাওয়া যায়—যা ব্যবসার জন্য ইতিবাচক।
টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক উদ্দিন জানান, সুস্থ ও বেশি মুকুল পেতে সময়ভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা জরুরি। মুকুল ঝরা রোধে পটাশ, বোরন ও জৈব সার, বিশেষ করে ভার্মিকম্পোস্ট কার্যকর। বোরনের ঘাটতি থাকলে মুকুল ঝরে যায়, তাই প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম বোরন মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পরপর স্প্রে করার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, “মুকুল আসার আগে ও পরে পটাশিয়ামযুক্ত সার প্রয়োগ করলে মুকুলের সংখ্যা ও ফলের মান বাড়ে। গুটি মটরদানার মতো হলে প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে স্প্রে করলে গুটি ঝরা কমে। তবে ফুল ফোটা অবস্থায় কোনো ধরনের স্প্রে না করার পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া, বেশি মুকুল পেতে ২-৩ মাস আগে থেকে সেচ বন্ধ রাখা এবং তিন বছরের কম বয়সী গাছের মুকুল ভেঙে দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, “জেলায় ১ হাজার ৪৭ হেক্টর জমিতে আম আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে রামু ও উখিয়ায় চাষ বেশি। আবহাওয়া তথ্যভিত্তিক পরামর্শের ফলে চাষীরা এখন আগাম সতর্ক হতে পারছেন।” মাসের শেষে বড় ধরনের তাপপ্রবাহ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ১৩ হাজার ৩৬৫ মেট্রিকটন আম উৎপাদন সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদ-এর সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মৌসুমি ফলের চক্রে পরিবর্তন আসছে। তাই আবহাওয়া ও জলবায়ু তথ্য ব্যবহার করে পরিকল্পিত কৃষি চর্চাই হতে পারে টেকসই সমাধান।”
চাষীরা বলছেন, আন্দাজ-নির্ভর চাষাবাদের দিন শেষ। তথ্যনির্ভর পরিচর্যায় ঝুঁকি কমিয়ে ভালো মুকুল পাওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন কক্সবাজারের আম চাষীরা।
ঢাকা/তারেকুর/জান্নাত