ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৩ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৮ ১৪৩২ || ১৩ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

আ.লীগ নেতার কাছে লাখ টাকার ল্যাপটপ আবদার করা ওসি প্রত্যাহার

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩০, ৩ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৬:৪৪, ৩ মার্চ ২০২৬
আ.লীগ নেতার কাছে লাখ টাকার ল্যাপটপ আবদার করা ওসি প্রত্যাহার

কুষ্টিয়ার খোকসায় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের কাছে ১ লাখ টাকা দামের ল্যাপটপের আবদার করে বিতর্কের জন্ম দেওয়া ওসি মোতালেব হোসেনকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। ওই আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে ল্যাপটপ এনে দেওয়ার জন্য এক ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন খোকসা থানার ওসি। সেই ল্যাপটপ না পেয়ে ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন সোমবার (২ মার্চ) রাতে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, রবিবার রাতে ওসি মোতালেব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি পরিদর্শক (তদন্ত) মোশারফ হোসেনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের জন্য ওসি মোতালেব হোসেনকে রবিবার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে অভিযুক্ত ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই রাতেই তিনি কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনে যোগ দেন বলে জানিয়েছে পুলিশের একাধিক সূত্র।

ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণ জানিয়েছেন, তিনি নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষায় সহায়তার জন্য আবেদন করলেও এখনো পুলিশ, সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপের মধ্যে আছেন। ওসি মোতালেবকে প্রত্যাহারের খবর তিনি পেয়েছেন। এর পর থেকে ওসির ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসীরা ও ক্ষমতাসীন দলের এক সাবেক নেতা তাকে মুঠোফোনে হুমকি দিচ্ছেন। রাজনৈতিক দলের নেতা তাকে (বর্ষণকে) ওসির পা ধরে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “সোমবার বেলা ১১টার দিকে জেলা পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা ফোন করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু, নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে মামলা করতে রাজি হইনি।”

মাহফুজুর রহমান বর্ষণ জানিয়েছেন, গত মাসের ২৪ তারিখের পর থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না তিনি।

গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা নাসির উদ্দিনের কাছে ১ লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ দাবি করেন ওসি মোতালেব হোসেন। সেটি এনে দেওয়ার দায়িত্ব দেন ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণকে। তবে, ৩০ হাজার টাকা দামের একটি ল্যাপটপ দেওয়া হলে সেটি ফেরত দেন ওসি। এখন লাগাতার হুমকিতে বিপর্যস্ত ওই ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিচার চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী বর্ষণ। পরে তা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন তিনি। দেওয়া হয় হত্যার হুমকিও। দুই মাস ধরে চলমান এসব ঘটনায় গত শুক্রবার জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর বিচার চেয়ে ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগ করেন।

খোকসা থানার ওসি মোতালেব হোসেনের বিরুদ্ধে এ চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। তার সঙ্গে একসময় সখ্য ছিল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণের। তিনি উপজেলা সদরের বাজারের বর্ষণ ইলেকট্রিকের মালিক। তার বাবা গোলাম ছরোয়ার একই বাজারের হার্ডওয়ার পণ্যের ব্যবসায়ী। তারা বলছেন, ওসির পক্ষ নিয়ে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান হুমকি দিয়ে গেছেন। ফোনে ব্যবসায়ীকে হত্যারও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী বর্ষণের অভিযোগ, গত ডিসেম্বরের শেষদিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা নাসির উদ্দিনের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ফোনের মালিকের সন্ধান করার জন্য বর্ষণকে ওসির কাছে পাঠান নাসির। এখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এর পর ওসি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি নাসির উদ্দিনের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ এনে দেওয়ার দায়িত্ব দেন বর্ষণকে। বর্ষণ জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকা থেকে একটি ল্যাপটপ এনে ওসিকে দেন। কিন্তু, ৩০ হাজার টাকা দামের ওই ল্যাপটপ ফেরত দেন ওসি। এর পর বর্ষণ ওসির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে শুরু হয় হুমকি দেওয়া। ওসির পক্ষে রাজন নামের এক ব্যক্তি হুমকি দিতে থাকেন। 

বর্ষণ আরো জানান, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় ওসি তার দোকানে গিয়ে ল্যাপটপ অথবা সমপরিমাণ টাকা পৌঁছে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি বর্ষণের বাড়ি গিয়ে ওসিকে ল্যাপটপ পৌঁছে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসেন রাজন।

এসব ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে বর্ষণ ২২ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ওসির বিচারের দাবিতে স্ট্যাটাস দেন। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওসি। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজন ওই ব্যবসায়ী ও তার বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসেন। একপর্যায়ে বর্ষণ ওই স্ট্যাটাস ফেসবুক থেকে সরিয়ে ফেলেন।

গত শুক্রবার রাতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ওই ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসক ও কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার বরাবর একটি আবেদন করেন। এতে তার ওপর ওসি ও সন্ত্রাসী বাহিনীর জুলুমের ঘটনা তুলে ধরেন।

এ প্রসঙ্গে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, তার কাছে অপরিচিত ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই ফোনদাতার পরিচয় নিশ্চিত হতে তিনি ব্যবসায়ী বর্ষণের মাধ্যমে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পর ওসি উল্টো তার (মেম্বারকে) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ তোলেন।

তিনি আরো জানান, বর্ষণের কাছে ওসি ল্যাপটপ চেয়েছিলেন। সে অনুয়ায়ী ৩০ হাজার টাকা দামের একটি ল্যাপটপ কিনে থানায় পাঠানো হয়। কিন্তু, সেটি ওসির পছন্দ না হওয়ায় ফেরত দিয়ে ঝামেলা শুরু করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ওসি মোতালেব হোসেন জানান, তার সঙ্গে ওই মেম্বারের দেখা হয়নি। কথা হয়নি। তিনি চাঁদা চাইলেন কী করে? 

বর্ষণ সম্পর্কে ওসি বলেন, ওই দোকানে মালপত্র কেনার জন্য দুই-একবার সেখানে গেছেন।

ঢাকা/কাঞ্চন/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়