খুলনায় শ্রমিকনেতা মাসুম হত্যা: কিলিং মিশনে ছিলেন তিন গ্রুপের ৮ কিলার
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা || রাইজিংবিডি.কম
খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অশোক ঘোষ।
খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহকে পূর্ব শত্রুতা ও রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আটজন ভাড়াটে খুনিকে দিয়ে তাকে হত্যা করানো হয়েছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ।
তদন্তে নিয়োজিত পুলিশ ও মাসুম বিল্লাহর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিলিং মিশনে অংশ নেন আট কিলার। তারা তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে মিশনে আসেন। এর মধ্যে গুলি করার জন্য একটি গ্রুপ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর জন্য একটি গ্রুপ ও সন্ত্রাসীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আরেকটি গ্রুপ কাজ করে।
খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর নির্দেশে এই হত্যা মিশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের কাছে তথ্য এসেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিলিং মিশনে শটগান দিয়ে গুলি করেন সৌরভ এবং পিস্তল দিয়ে পর পর দুই রাউন্ড গুলি করেন অশোক ঘোষ। এই অশোককে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা ও পুলিশ আটক করেন। তার কাছ থেকে গুলিসহ বিদেশি পিস্তল জব্দ করা হয়।
বুধবার রাতে শহরের ডাকবাংলো মোড়ে খুন হন খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পুলিশ খুলনা মহনগরের সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে জাবেদ গাজী নামে আরেকজনকে আটক করেছে। তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীসহ সাত থেকে আটজনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “এটি ছিল একটি কন্ট্রাক্ট কিলিং। জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে খুলনা সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী হত্যা মামলা করবেন।”
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানান, আটক হওয়া অশোক ঘোষকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মাসুম বিল্লাহর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৪ মার্চ) দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে স্ত্রী ও ভাতিজার মেয়েকে নিয়ে মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের বাড়ি থেকে খুলনায় আসেন। প্রথমে তারা খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে একজন রোগী দেখতে যান। সেখান থেকে বিকেলে তারা নিউ মার্কেটে কেনাকাটা শেষে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে ইফতার করেন। ইফতার শেষে নগরীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র ডাকবাংলা মোড়ে কেনাকাটার জন্য গেলে দুর্বৃত্তরা তাকে ঘিরে ধরে প্রথমে চাপাতি দিয়ে পিছনে আঘাত করে।
ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, তখন প্রাণ বাঁচাতে মাসুম বিল্লাহ বাটার শোরুমের মধ্যে প্রবেশ করেন। তখন পেছন থেকে কোপানো গ্রুপের সদস্যরা প্রথমে তার ডান পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি বাটার শোরুমে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা তার গলায় ও পিঠে গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় মাসুম বিল্লাহকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত তাকে ঘোষণা করেন।
মাসুম বিল্লাহর চাচা মহিউদ্দীন শেখ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বলেন, “মাসুম বিল্লাহ রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ছিলেন। এই মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। সেই কারণে মাসুম বিল্লাহ ফের সভাপতি পদে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ কারণেইে প্রতিপক্ষ গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে তাকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করিয়েছে।”
এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি মহিউদ্দিীন শেখের।
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে মাসুম বিল্লাহকে রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামে দাফন করা হয়েছে। তার জানাজায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলালসহ বিএনপি নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের মৃত মিনহাজ উদ্দীন মুন্সী ওরফে মীনা মুন্সীর পুত্র। তিনি দুটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন এবং আগে র্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বড় ভাই নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল ২০২০ সালে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
ঢাকা/নুরুজ্জামান/রাসেল