ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১২ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২৭ ১৪৩২ || ২৩ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

তামাকের বিকল্পে স্কোয়াশ চাষে তিনগুণ লাভ নাসিরের

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:১৯, ১২ মার্চ ২০২৬  
তামাকের বিকল্পে স্কোয়াশ চাষে তিনগুণ লাভ নাসিরের

তামাকের বিকল্প ফসল হিসেবে উচ্চমূল্যের সবজি স্কোয়াশ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন নাসির উদ্দিন। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার এই কৃষক ৪০ শতাংশ জমিতে বিদেশি সবজি স্কোয়াশ চাষ করে প্রায় ৩ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন।

এ চাষে মোট ২৭ হাজার টাকা খরচ করে ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার স্কোয়াশ বিক্রি করেছেন তিনি। তার জমিতে এখনো যে স্কোয়াশ রয়েছে, সেখান থেকে আরো প্রায় দেড় লাখ টাকার সবজি বিক্রি হবে বলে আশা করছেন।

আরো পড়ুন:

কৃষক নাসির উদ্দিন জানান, তিনি জমি থেকেই প্রতি পিস স্কোয়াশ ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করেন। প্রতিদিনই তার জমি থেকে স্কোয়াশ বিক্রি হচ্ছে।

এলাকাজুড়ে যেখানে তামাক চাষ বেশি হয়, সেখানে কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি স্কোয়াশ চাষ শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করেছে যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি বিষমুক্ত ও নিরাপদ উপায়ে স্কোয়াশ চাষের ওপর তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি কৃষি অফিসের মাধ্যমে সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় উপকরণও পান। ফলে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে এ সবজি উৎপাদন করতে পারছেন।

তিনি বলেন, “তামাকে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং বিক্রি হয় প্রায় এক লাখ টাকা। সেখানে আমি মাত্র ২৭ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় তিনগুণ লাভ পাচ্ছি। বিক্রির কোনো ঝামেলা নেই, পরিশ্রমও অনেক কম। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার স্কোয়াশ বিক্রি করছি।”

তিনি আরো জানান, পোকা দমনে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করেন না। বাড়িতে তৈরি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করায় রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কম হয়েছে এবং ফলন ভালো হয়েছে।

তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক কৃষক এখন স্কোয়াশ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষক শাহিন আলী জানান, নাসির উদ্দিনের পরামর্শে তিনি এক বিঘা জমিতে স্কোয়াশ চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে ৯০ হাজার টাকার স্কোয়াশ বিক্রি করেছেন এবং আরও প্রায় এক লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন।

স্থানীয় কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজেও তামাক চাষ করি। বিঘাপ্রতি তামাকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়, বিক্রি হয় প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু পরিশ্রম অনেক বেশি। স্কোয়াশ চাষ তুলনামূলক বেশি লাভজনক মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমিও এ চাষ করতে চাই।”

আরেক কৃষক ইসারুল হক বলেন, “তামাক, মরিচ, গম ও আলু চাষ করেছেন তিনি। তামাক কোম্পানি সার ও বিষ দেওয়ায় এতদিন তামাক চাষ করেছেন। তবে সরকার যদি স্কোয়াশের দামের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে এ সবজি চাষই ভালো হবে।”

কৃষক আব্দুল হাকিম মালিথা বলেন, “কম পরিশ্রমে তামাকের বিকল্প হিসেবে স্কোয়াশ চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এই জমিতে স্কোয়াশ চাষে যে আয় হবে, তামাকে তা সম্ভব নয়। নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।”

কৃষক আব্দুল গফুর জানান, আগে তিনি ১০ থেকে ১২ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করতেন। এখন তিনি সেই চাষ ছেড়ে দিয়েছেন এবং আর তামাক চাষ করবেন না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আরেক কৃষক শামিম রেজা বলেন, তামাকের ক্ষতিকর দিক জানার পর তিনি তামাক চাষ ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে তিনি সবজি চাষ করছেন।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য নবির উদ্দিন বলেন, “আমরা মাদকমুক্ত দেশ গড়তে চাই। এজন্য মাঠ থেকে তামাক চাষ দূর করা জরুরি। আমাদের এলাকার কৃষক নাসির উদ্দিন স্কোয়াশ চাষে সফল হয়েছে। তার দেখাদেখি আরও কৃষক এগিয়ে এলে তামাক চাষ কমে যাবে।”

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, স্কোয়াশের মতো উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, “নাসির উদ্দিন ও শাহিন আলী স্কোয়াশ চাষ করে সফল হয়েছেন। তামাক ছেড়ে নিরাপদ পদ্ধতিতে এ সবজি চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আমরা প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবস আয়োজন করছি।”

যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প–এর মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মাসুম আব্দুল্লাহ বলেন, “স্কোয়াশ একটি উচ্চমূল্যের ফসল। এটি চাষ করে কৃষকরা বেশি লাভবান হতে পারেন। তাই নিরাপদ পদ্ধতিতে স্কোয়াশ চাষ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী দেওয়া হচ্ছে।”

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দৌলতপুর উপজেলার কৃষকরা তামাক চাষে বেশি আগ্রহী হলেও কৃষি বিভাগ বিকল্প ফসল চাষে তাদের সহায়তা করছে। উচ্চমূল্য ও পুষ্টিসমৃদ্ধ স্কোয়াশ ওই এলাকার তামাকের বিকল্প ফসল হতে পারে এবং ইতোমধ্যে অনেক কৃষক এ চাষে লাভবান হচ্ছেন।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, যশোর কৃষি অঞ্চলের ৩১টি উপজেলায় উচ্চমূল্যের স্কোয়াশ চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে প্রকল্পটি। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য বাজার ও উদ্যোক্তা তৈরিতেও কাজ করা হচ্ছে। এতে তামাকের পরিবর্তে স্কোয়াশসহ অন্যান্য সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

ঢাকা/কাঞ্চন/জান্নাত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়