ঢাকা     রোববার   ১৫ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১ ১৪৩২ || ২৫ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‘কালো সোনা’ খ্যাত পেঁয়াজ বীজ, ৫ বছরে উৎপাদন বেড়েছে শতগুণ

মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল, ঠাকুরগাঁও  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৫, ১৫ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৩:০৫, ১৫ মার্চ ২০২৬
‘কালো সোনা’ খ্যাত পেঁয়াজ বীজ, ৫ বছরে উৎপাদন বেড়েছে শতগুণ

মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ে শতগুণ বেড়েছে ‘কালো সোনা’ খ্যাত পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসেই অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকায় দিন দিন এই ফসল চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

এদিকে, পর্যাপ্ত মৌমাছি না থাকায় বীজ উৎপাদনে মানুষের হাতেই করা হচ্ছে পরাগায়ন। ফলে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারীদের। এই বীজ দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

আরো পড়ুন:

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলার পাঁচটি উপজেলায় পেঁয়াজ বীজের চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বালিয়াডাঙ্গীয়। বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠজুড়ে চোখে পড়ে পেঁয়াজ গাছের সবুজ ডাঁটা আর কদম ফুলের মতো সাদা শুভ্র ফুলের সমারোহ। সবুজ মাঠ আর সাদা ফুলের এই দৃশ্য প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর চিত্র। পর্যাপ্ত মৌমাছি না থাকায় কৃষকরা নিজেরাই হাতে হাতে পরাগায়ন করছেন। এই কাজে যুক্ত হয়েছেন এলাকার শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক। ফলে গ্রামীণ নারীদের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে জেলায় মাত্র ৪০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ শুরু হয়। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আবাদ শতগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৫ হেক্টরে। যেখানে গত মৌসুমেই আবাদ হয়েছিল প্রায় ৫৪৭ হেক্টর জমিতে।

স্থানীয় শ্রমিকরা জানান, বছরের অনেক সময় এলাকায় কাজের সুযোগ থাকে না। পেঁয়াজ বীজের আবাদ শুরু হওয়ায় এখন তারা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন। বিশেষ করে নারীরা ক্ষেতে কাজ করে যে আয় করছেন, তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়ালেখার খরচও মেটাতে পারছেন। তাদের আশা, আগামীতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ  বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। 

হাতের সাহায্যে ফুলের পরাগায়ন করছেন নারী শ্রমিকরা


বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পেঁয়াজ চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এদিকে গত বছর পেঁয়াজ বীজ আবাদ হয়েছিল ৮ বিঘা জমিতে। এবার ৫৪ বিঘা জমিতে এ ফসল আবাদ হয়েছে। দিনদিন পেঁয়াজ বীজের আবাদ বাড়ছে।”

রোকসানা বিবি বলেন, “পেয়াজের ক্ষেতগুলোতে পরাগায়নের কাজ করে আমার সংসার চলছে। অন্য সব কাজের চাইতে এটি সহজ। আমরা হাজিরায় কাজ করি। প্রতিদিন হাজিরা পাই ৪০০ টাকা। পেঁয়াজ পরাগায়নের কাজ আশায় আমাদের কাজের সুযোগ বেড়েছে। এর আগে, কাজ না পয়ে বসে থাকতাম।”

কৃষক জামাল বলেন, “এ বছর পেঁয়াজের বীজের ভালো ফলন হয়েছে। আমরা সরকারিভাবে বীজ বিক্রি করতে পারছি না। যদি সরকারিভাবে বীজ বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হয় তাহলে আমরা দামের একটা নিশ্চয়তা পেতাম। আরো পেঁয়াজ বীজ চাষে ঝুঁকত কৃষকরা। সরকারিভাবে বীজ বিক্রির সুযোগ না থাকায় আমরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”

পেঁয়াজ চাষি ও উদ্যোক্তা আব্দুল বারেক জানান, এবার আবাদ ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে ভালো লাভের আশা করছেন তিনি। বর্তমানে ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। আর এক বিঘা জমিতে উৎপাদন হয় প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ কেজি পেঁয়াজ বীজ। বাজারে প্রতি কেজি বীজের দাম যদি ২ হাজার টাকা হয়, তাহলে বিক্রি হয় প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো। এতে লাভ থাকে প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।

পেঁয়াজ বীজ চাষি সাদ্দাম হোসেন জানান, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন দিনদিন বাড়লেও সরকারি অনুদান বা কৃষি ঋণের সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আরো নতুন উদ্যোক্তা এই খাতে যুক্ত হবেন বলে মনে করেন তিনি।

কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা এবং বিএডিসির মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে কৃষি বিভাগ। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আলমগীর কবির বলেন, পেঁয়াজ চাষিদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় আগামীতে জেলায় পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন আরো বাড়বে এমনটি আশা করছি।”

ঢাকা/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়