বৃষ্টির পানিতে রংপুরে নিমজ্জিত আলু, শঙ্কায় চাষিরা
রংপুর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে আলু তুলছেন এক কৃষক।
উত্তরাঞ্চলের প্রধান আলু উৎপাদনকারী এলাকা রংপুর। ভরা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ক্ষেতে জমে থাকা পানিতে আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তারা জানান, আলু পচে গেলে তাদের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ৫৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এখনো প্রায় ৫৫ শতাংশ জমির আলু উত্তোলন হয়নি। জমিতে পানি জমে থাকলে আলু পচে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের পরামর্শ দিচ্ছে তারা।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে জেলার পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়ন ও আশপাশের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, রাতের বৃষ্টিতে অনেক জমির আলু পানিতে তলিয়ে আছে। কৃষকেরা জমি থেকে আলু তুলে কাদামাটির মধ্যেই জড়ো করে রাখছেন, আবার কেউ কেউ জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছিলেন। সব জমি থেকে পানি সরানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
পারুল ইউনিয়নের নাকদাহ এলাকার চাষি ইসমাইল হোসেন জানান, গত বছরের লোকসান কাটাতে ধারদেনা করে দুই একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন এবার। তিন দিন আগে আলুর গাছ তুলে ফেলেছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই জমি থেকে আলু তুলে সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল তার। রাতের টানা বৃষ্টিতে জমির নালা কূপে পানি জমে গেছে। ফলে আলু তোলার আগে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক ফয়জুর রহমান বলেন, “দুইদিন আগে আলু তুলে শুকানোর জন্য জমিতে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে সেগুলো জড়ো করে সংরক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাদামাটির মধ্যে আলু পড়ে থাকায় তা জড়ো করা সম্ভব হয়নি। রাতের বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে। এখন কাদা পানির মধ্যেই আলুগুলো সংরক্ষণ করে উঁচু জায়গায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
ক্ষেত থেকে আলু নিয়ে ফিরছেন দুই নারী শ্রমিক
দেউতি এলাকার আলুচাষি আমজাদ হোসেন জানান, দুই এক দিনের মধ্যেই জমি থেকে আলু তোলার কথা ছিল। বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় এখন আলু তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিক দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন তিনি। এতে খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, গত বছর আলু চাষ করে প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণের বোঝা হয়েছে। এবার চার একর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে। কিন্তু বাজারে আলুর দাম কম থাকায় লাভের আশা কমে গেছে। পাইকারি বাজারে এখন আলুর দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৯ টাকা, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।
পীরগাছা উপজেলার ছেচাকান্দি এলাকার কৃষক আকমল হোসেন সাত বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছিলেন তিনি। ফলন ভালো হলেও হঠাৎ বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় জমিতে পানি জমে গেছে। এখন পানি সরানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তার মতে, বাজারে আলুর দাম ইতোমধ্যে কম। বৃষ্টির কারণে দাম আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকার আলুচাষি মতিউর রহমান বলেন, সারের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের মধ্যেও ধারদেনা করে আলু চাষ করেছেন অনেক কৃষক। বাজারে দাম কম থাকায় অনেকে আলু জমিতে রেখে দিয়েছিলেন ভালো দামের আশায়। হঠাৎ বৃষ্টিতে সেই আশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তার মতে, গেল এক সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলে আলু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে। এই দামে কৃষকের উৎপাদন খরচে ৩ থেকে ৪ টাকা কেজি ধরে লোকসান হবে বলেও জানান তিনি।
নালা কেটে জমি থেকে পানি সরানোর চেষ্টায় কৃষক
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরর রংপুর কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার রাতে রংপুরে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত দুই দিন ধরে আবহাওয়া কিছুটা বৈরী থাকলেও আগামী আরো দুই-তিন দিন মেঘলা ও বৃষ্টির এমন বৈরি আবহওয়া থাকবে। দুই-তিন দিন পর চলমান এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “রংপুর অঞ্চলে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় আলুর ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করে আলু রক্ষার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনর রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, “বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা আগে থেকেই সংকটে রয়েছেন। তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতির আশঙ্কা আরো বেড়েছে। তিনি আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
ঢাকা/আমিরুল/মাসুদ