মৌলভীবাজারের হাওরে ৫০ কোটি টাকার ধান নষ্ট
আব্দুল আজিজ, মৌলভীবাজার || রাইজিংবিডি.কম
মৌলভীবাজারের হাওর অঞ্চলে কৃষকের ঘরে ঘরে হাহাকার। অকালে ফসল হারানোর বেদনা কাউয়াদিঘি ও হাকালুকি হাওর জনপদে। এক সপ্তাহের বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে পাকা ও আধাপাকা ধান। প্রায় ৫০ কোটি টাকার ধান পচে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
হাওর জনপদের কৃষকরা জানিয়েছেন, হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান হারিয়ে তারা দিশেহারা। ধান কাটার মৌসুমের শুরুতে জ্বালানি তেল ও হারভেস্টারের অপ্রতুলতার কারণে তারা দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেননি।
তারা বলছেন, হাওরে ৩০ শতাংশ ধান কর্তন করা সম্ভব হয়েছে। আকস্মিক ঢলের পর এখন পানির নিচ থেকে যে ফসল ওঠানো হচ্ছে, তা কোনো কাজে আসছে না। নিরবচ্ছিন্ন রোদ না থাকায় ধান পচে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার কার্যালয় জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এ জেলার হাওর ও নন-হাওর এলাকায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাওর এলাকায় ৮৭ শতাংশ জমিরি ধান কর্তন করা হয়েছে। উঁচু এলাকায় কাটা হয়েছে ৩৪ শতাংশ। ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৮ হাজার কৃষক।
হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকার পথে-ঘাটে পড়ে আছে পচা ধানের স্তূপ। একটু উচুঁ স্থান বা রাস্তায় ধান জমা করে রেখেছেন কৃষকরা। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছেন তারা। ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়া চালাতে পারছেন না। এতে ধান পচে যাচ্ছে। অনেকেই পচা ধান ফেলে দিচ্ছেন জমিতে।
হাওরপাড়ের কৃষক সদর উপজেলার বিরইমাবাদের পঙ্কি মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেছেন, “২০ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছি। ৩ বিঘার ধান কেটে আনছি। বাকি সব পানির নিচে চলে গেছে। এখন আর বুকসমান পানিতে কেউ নামতে চায় না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।”
সদর উপজেলার বিরইমবাদের নজরুল ইসলাম ও মুকিত মিয়া বলেন, “হাওর কাউয়াদিঘির লামার বাঁধ এলাকায় আমাদের ৯০ বিঘা খেত ছিল। সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। সারা বছরের খোরাকি পানির নিচে চলে গেছে। এখন কী করব, তা নিয়ে হতাশায় আছি। ফসল হারানোর এই বেদনা ভুলতে পারছি না। বুকসমান পানির তল থেকে ধান উঠাইয়া লাভ নেই।”
রাজনগর উপজেলার পাচঁগাও গ্রামের মজর মিয়া বলেন, “কাউয়াদিঘি হাওরের মাঝের বাঁধ এলাকায় আমাদের ২৫ বিঘা জমিতে পাকা ধান ছিল। শ্রমিক ও হারভেস্টার সংকটের কারনে ধান উঠাইতে পারিনি। কোনোমতে ৪-৫ বিঘার ধান তুলেছি। এখন সারা বছর কী খাব, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বর্গাচাষি সুজন মিয়া বলেন, “ঋণ নিয়ে ১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। কোনোমতে ২ বিঘা কর্তন করেছি। এখন মহাজনের টাকা কেমনে দেবো, তা নিয়ে দিশেহারা।”
সরেজমিনে রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের মেদেনীমহল ও জগন্নাথপুর গ্রামে গেলে পচা ধানের আঁষটে গন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় কথা হয় জগন্নাথপুরের আমীন আলীর সঙ্গে।
আমীন আলী বলেন, “আমার ৭ বিঘা জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। ২ বিঘা জমিতে বুকসমান পানি থেকে ধান কেটে বাড়িতে এনে এখন শুকানো যাচ্ছে না। পচা গন্ধ বের হচ্ছে। ধানে চারা গজাচ্ছে। এ ধান ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজারের ৭টি উপজেলায় হাওরে ২ হাজার ৪৪২ হেক্টরের বেশি জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ১৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেছেন, “আকস্মিক ঢলে ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৮ হাজার কৃষক। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, হাওরে ৮৭ শতাংশ ধান কর্তন হয়েছে, নন-হাওরে ৩৪ শতাংশ। তবে, মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মতে, হাওর ও নন-হাওরে ধান কর্তনের পরিমাণ ৩০ শতাংশ। বিষয়টি সঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ হিসাব না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।”
ঢাকা/রফিক
হাম ও হামের উপসর্গে একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু