গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় চিন্তায় খামারিরা, মাঝারি গরুতে নজর ক্রেতাদের
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার || রাইজিংবিডি.কম
কক্সবাজারের খরুলিয়া বাজারে শুরু হয়েছে কোরবানির পশু বেচাবিক্রি।
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে পুরোপুরি প্রস্তুত পর্যটনশহর কক্সবাজারের পশুর খামারগুলো। কোরবানির পশুর বাজারগুলোতে এখন সাজ সাজ রব। খামারিদের ব্যস্ততা তুঙ্গে, আর শেষ মুহূর্তের এই প্রস্তুতিতে যুক্ত হয়েছেন ক্রেতারাও। অনেকেই হাটের ভিড় এড়াতে আগেভাগেই খামারে গিয়ে পছন্দের পশুটি বুকিং করে রাখছেন। এবারের কোরবানির বাজারে চাহিদার তুলনায় পশুর যোগান বেশি। তবে, গো-খাদ্যের চড়া দামের কারণে কপালে চিন্তার ভাঁজ খামারিদের।
ক্রেতারা জানান, খামারে গরুর দাম অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের ভরসা মাঝারি সাইজের গরু। হাট শুরু হলে পরিস্থিতি বোঝা যাবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিন্ধিত ছোট-বড় খামারের সংখ্যা ৮ হাজার ২৮৭টি। এসব খামারে কোরবানিকে সামনে রেখে ১ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৩টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। চলতি বছর জেলায় কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৯২টি। অর্থাৎ, চাহিদার চেয়েও ২৪ হাজার ৭৭১টি পশু বেশি রয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় পাঠানো সম্ভব হবে।
খামারে প্রস্তুতকৃত পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ৩ হাজার ৮৭৪টি। যার মধ্যে রয়েছে ৬৩ হাজার ১৩৯টি ষাঁড়, ২৪ হাজার ২৮৩টি বলদ এবং ১৬ হাজার ৪৫১টি গাভী। এছাড়া প্রস্তুত রয়েছে ৬ হাজার ২৭৯টি মহিষ, ৩৩ হাজার ৪৫২টি ছাগল, ১৪ হাজার ৪৬৩টি ভেড়া এবং অন্যান্য প্রজাতির আরও ১৫টি পশু।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ.এম. খালেকুজ্জামান বলেন, “এবার জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না, চাহিদার তুলনায় রেকর্ড সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।”
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ৯৪টি পশুর হাট বসেছিল, যার মধ্যে ৪৮টি স্থায়ী এবং ৪৬টি ছিল অস্থায়ী। এবার এখনো অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই অস্থায়ী হাট ইজারার কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে।
খামারিদের চোখে রঙিন স্বপ্ন, বুকে আশঙ্কার কাঁপন:
উৎসবের আমেজ থাকলেও খামারিদের মনে রয়েছে এক ধরনের অজানা আশঙ্কা। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার পশু লালন-পালনের খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে বলে জানান তারা।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খরুলিয়া খামারপাড়া এলাকার খামারি নুরুল হক জানান, তার খামারে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১২০টি গরু রয়েছে। প্রতিবছর তার খামারে ষাঁড় ও বলদ মিলিয়ে এ রকম গরু থাকে। কিন্তু গতবছরের তুলনায় এ বছর গো-খাদ্যের দাম বেশি।
তিনি বলেন, “ভুষি-খৈলের যে দাম, তাতে অনেক ছোট খামার তো বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ভয় হচ্ছে, বাজারে গরুর যোগান ঠিক থাকলেও লালন-পালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।”
রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকার দুই তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ উল্লাহ ও সাজ্জাদ হোসেন যৌথভাবে একটি ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামার পরিচালনা করছেন। তাদের খামারে এবার প্রায় ৫০টি উন্নত জাতের গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত।
আরিফ উল্লাহ জানান, তাদের খামারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৮ লাখ টাকা, আর সর্বনিম্ন দাম ৩ লাখ টাকার নিচে নয়।
সাজ্জাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার গম, ভুট্টা ভাঙা, খৈল ও ভূষিসহ সব ধরনের খাবারের দাম মণপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটাতাজাকরণে যে খরচ হয়েছে, তাতে হাটে যদি ন্যায্য দাম না পাওয়া যায়, তবে পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে।”
কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের খামারি মোর্শেদ আলম বলেন, “আমার খামারে ১৫টি গরুর মধ্যে ৫টি এবার বাজারে তোলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পাঁচ মণ ওজনের একটি আকর্ষণীয় ষাঁড়ের দাম চাইব ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া, মাঝারি আকারের তিন থেকে চার মণ ওজনের গরুগুলো ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হতে পারে বলে আশা করছি।”
চড়া খরচের বাজারে টিকতে না পেরে উখিয়ার রাজাপালং এলাকার প্রান্তিক খামারি রমিজ বলেন, “সংসারের টানাপোড়েন আর গো-খাদ্যের দামের সাথে যুদ্ধ করতে না পেরে গত মাসেই আমার ৩টি গরু লোকসানে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এখন সাধারণ কৃষকদের পক্ষে গরু লালন-পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বাজারে মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি:
২০২৬ সালের মে মাসের বর্তমান বাজার দর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পশুখাদ্যের বাজারে আগুন। বর্তমানে প্রতি কেজি ভুট্টার গুঁড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, গম ভাঙা ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, গমের ভুষি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা এবং খৈল ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া খামারিদের অতি প্রয়োজনীয় ২৫ কেজির ক্যাটল ফিডের এক একটি বস্তা কিনতে খামারিদের গুণতে হচ্ছে ১১০০ থেকে ১ ৩০০ টাকা।
পশুর দাম বাড়ার কারণে এবারো বাজারে মাঝারি আকারের গরুর দিকেই ক্রেতাদের মূল নজর থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ২ থেকে ৩ মণ মাংসের গরুর চাহিদা থাকবে সবচেয়ে বেশি। বড় গরুর ক্রেতা সীমিত হওয়ায় পশুর মালিকদের কিছুটা লোকসানের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার নতুন বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা শফিউল আলম বলেন, “এখনো হাটে পশু ওঠা শুরু করেনি, তবে খামারগুলোতে যে দাম চাওয়া হচ্ছে তা শুনেই চোখ কপালে ওঠার দশা। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের ভরসা মাঝারি সাইজের গরু। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত বাজার কেমন দাঁড়ায়।”
একইভাবে রুমালিয়ারছরা এলাকার বাসিন্দা হাসান শরীফ জানান, তিনি খামার ঘুরে ৬ মণ ওজনের একটি বলদ পছন্দ করেছেন, বিক্রেতা দাম চাচ্ছেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, “আজ থেকে দুই-তিন বছর আগেও এই সাইজের একটা ভালো গরু দুই লাখ টাকার অনেক নিচে পাওয়া যেত। এবার বাজেট মেলানোই কঠিন হয়ে যাবে।”
সদরের ঘাটপাড়ার দেলোয়ার উসমান বলেন, “গো-খাদ্যের দাম বাড়ার অজুহাতে এবার খামারিরা পশুর দাম একটু বেশিই চাচ্ছেন। মাঝারি সাইজের একটা গরুর দামও সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা চাচ্ছি, হাটে যেন পশুর যোগান পর্যাপ্ত থাকে এবং সিন্ডিকেটমুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়, যাতে বিক্রেতারাও ন্যায্য মূল্য পান আর আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতারাও সাধ্যের মধ্যে পছন্দের পশু কিনতে পারেন।”
জেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট খরুলিয়া বাজারের ইজারাদার কেএম রহিম উদ্দীন বলেন, “জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে একদম ঝামেলামুক্ত এবং নিরাপদ পরিবেশে পশু কেনাবেচা করতে পারেন, সেজন্য আমরা হাটে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি। বাজারে এবার পশুর যোগান ও ক্রেতাদের যে আগ্রহ দেখছি, তাতে বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে এবার এই জেলায় সর্বোচ্চ বেচাবিক্রি হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি:
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ.এম. খালেকুজ্জামান বলেন, “গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খামারিদের উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে এটা সত্য। তবে, খরচ কমিয়ে আনতে আমরা খামারিদের বিকল্প হিসেবে কাঁচা ঘাস ও খড়ের সঠিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছি। একই সঙ্গে পশুকে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের ক্ষতিকর হরমোন বা ওষুধ যাতে ব্যবহার না করা হয়, সে ব্যাপারে আমাদের টিম মাঠে সতর্ক রয়েছে।”
হাটের নিরাপত্তা ও জালিয়াতি রোধে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, “কোরবানির হাটগুলোকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন স্থাপনের পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পশুর হাটে বা রাস্তায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্মে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।”
ঢাকা/মাসুদ
গণমাধ্যম কমিশন হচ্ছে, জুনের মধ্যে পরামর্শক কমিটি: তথ্যমন্ত্রী