ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২১ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩৩ || ৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

১৮৭ টাকার জীবন-সংসার

মোসাইদ রাহাত, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১৩, ২১ মে ২০২৬   আপডেট: ১৫:১৬, ২১ মে ২০২৬
১৮৭ টাকার জীবন-সংসার

বাগান থেকে চা পাতা সংগ্রহ করছেন কয়েকজন নারী শ্রমিক।

বাংলাদেশে বছরে ৯ কোটির বেশি কেজি চা উৎপাদিত হয়। দেশের ১৭২টি চা-বাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক শিল্পখাত। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চায়ের পরিচিতি বাড়ছে। যে শ্রমিকদের ঘামে এই শিল্প টিকে আছে, তাদের জীবনমান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক চা দিবসে তাই উৎসবের পাশাপাশি সামনে এসেছে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কম মজুরি ও অধিকার সংকটের বাস্তবতা।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিন শুরু করেন। রাস্তার পাশের ছোট দোকান, অফিসপাড়া কিংবা গ্রামীণ বাজার সবখানেই চায়ের উপস্থিতি। কিন্তু সহজলভ্য এই পানীয়র পেছনে থাকা শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম খুব কমই আলোচনায় আসে।

আরো পড়ুন:

চা-শ্রমিকদের বর্তমান দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। ২০২২ সালে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন শ্রমিকেরা। কয়েক দফা আন্দোলন ও ধর্মঘটের পর মজুরি বাড়লেও দাবি পূরণ হয়নি।

সিলেট ক্যাথলিক ডায়োসিসের শান্তি ও ন্যায়বিচার কমিশনের আহ্বায়ক ফাদার জোসেফ গোমেস বলেন, “চা-বাগানের বাইরের সাধারণ দিনমজুরও ৫০০ টাকা মজুরি পান।  চা-শ্রমিকেরা এখনো ১৮৭ টাকায় কাজ করছেন। এই মজুরিতে পরিবার চালানো বাস্তবে অসম্ভব। তাছাড়া, অনেক বাগানে শ্রমিকরা সময়মতো মজুরিও পান না। কোথাও কোথাও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকে। এতে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন তারা।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৭৪ শতাংশ চা-শ্রমিক পরিবার এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। নিরক্ষরতার হারও উদ্বেগজনক। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, চা-বাগান এলাকার ১০ জন অভিভাবকের মধ্যে সাতজনই পড়তে-লিখতে পারেন না।

চা পাতা সংগ্রহে বাগানে প্রবেশ করছেন নারী শ্রমিকরা


চা-বাগান এলাকায় শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশু মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা নানা ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মূলধারার বিদ্যালয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৭২টি চা-বাগানে নিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। পরিবার ও অস্থায়ী শ্রমিকসহ এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। শ্রমিকনেতাদের দাবি, এদের বড় অংশের কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরির স্বীকৃতি নেই। ফলে চাকরি হারানো, মজুরি বঞ্চনা বা অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত।

চা-শ্রমিকদের ইতিহাসও বঞ্চনার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বর্তমান ভারতের বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা অঞ্চল থেকে বহু মানুষকে চা-বাগানে কাজের জন্য আনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও তাদের জীবনযাত্রার কাঠামোগত বৈষম্য খুব একটা বদলায়নি। এখনও অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার বাগান এলাকার জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত।

চা-বাগানের সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ পাতা তোলার দায়িত্বও মূলত নারীদের ওপর। প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে মজুরি কেটে নেওয়া হয়। বৃষ্টি, অসুস্থতা বা শারীরিক ক্লান্তির বিষয়ও অনেক সময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিক নেতা নমিতা রায় বলেন, “বর্তমান বাজারে ১৮৭ টাকা মজুরিতে একটি পরিবার চালানো খুবই কষ্টকর। দ্রব্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে, তাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। আমরা চাই, শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবন নিশ্চিত হোক।”

লাক্কাতুরা চা-বাগানের কাজ করা প্রদীপ কৈরী বলেন, “চা-বাগানের শ্রমিকেরা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের জীবনমানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক চা দিবসে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।”

চা-গবেষক শামসুল হুদা বলেন, “চা-বাগানের জমির লিজ নবায়নের সময় শ্রমিকদের অধিকার, পুনর্বাসন ও বসবাসের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু, বাস্তবে এখনো সে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা-শ্রমিকেরা একই জায়গায় বসবাস ও কাজ করলেও জমির ওপর তাদের কোনো স্বীকৃত অধিকার নেই, যা বড় ধরনের সামাজিক বৈষম্যের উদাহরণ।”

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট ব্রাঞ্চের ম্যানেজার জি.এম. শিবলী বলেন, “চা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও এই শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চা শ্রমিকদের ন্যায্য ও সময়োপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা ছাড়া তাদের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আসবে না, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।”

তিনি বলেন, “শুধু মজুরিই নয়, চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ, নিরাপদ আবাসন এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এখনো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যা দীর্ঘদিন ধরে চা শিল্পের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে সরকার, বাগান মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এককভাবে কোনো পক্ষের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।”

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়