আইসিডিডিআরবি
টিকাদানের ঘাটতি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
বাংলাদেশে টিকাদানের ঘাটতি এবং টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরাবির্ভাব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে নতুন একটি পলিসি ব্রিফ। এতে বলা হয়েছে, সংক্রমণ কমানো, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআর,বি-এর নেতৃত্বে গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (জিএআরপি) এই পলিসি ব্রিফটি প্রকাশ করেছে। এতে টিকাকে শুধু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো এবং ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার রোধের একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পলিসি ব্রিফে বলা হয়েছে, টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ কমলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও কমে, ফলে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারও হ্রাস পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাই টিকাদানকে এএমআর মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এই উদ্যোগে বাংলাদেশ ছাড়াও আইভরি কোস্ট, ভারত, কেনিয়া, মোজাম্বিক, নেপাল, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা ও ভিয়েতনাম যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ অংশের পলিসি ব্রিফটি তৈরি হয়েছে সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সংস্থা এবং প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে। এতে সহযোগিতা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান।
পলিসি ব্রিফটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৯১১ জনের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৯ জনের বেশি রোগীকে নিশ্চিত বা সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আইসিডিডিআর,বি-এর সংক্রামক রোগ বিভাগে এন্টারিক ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ইউনিটের বিজ্ঞানী এবং গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ বাংলাদেশের সভাপতি ডা. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, “টিকাদানের ঘাটতি জনস্বাস্থ্যে অর্জিত অগ্রগতিকে দ্রুত বিপর্যস্ত করতে পারে।”
তিনি বলেন, “টিকা প্রতিটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন কমায়। হামের চলমান প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে টিকাদানের ঘাটতি কত দ্রুত জনস্বাস্থ্যের অর্জনকে পিছিয়ে দিতে পারে।”
অন্যদিকে ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট-এর ফেলো এবং পার্টনারশিপ পরিচালক ডা. আর্টা কালানক্সি বলেন, “এএমআর মোকাবিলায় নজরদারির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”
বিশ্বব্যাপী এএমআর এখন বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এএমআরজনিত কারণে বিশ্বে ৩ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
পলিসি ব্রিফ অনুযায়ী, ২০২১ সালে শুধু বাংলাদেশেই এএমআর-সম্পর্কিত মৃত্যু ছিল ৯৬ হাজার ৮৭৮ জন, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪ জনের মৃত্যু সরাসরি এএমআরের কারণে।
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল, পোলিও দূরীকরণ এবং রুবেলা নিয়ন্ত্রণে বড় সাফল্য দেখিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এসব অর্জন স্থায়ী নয়। টিকাদানের কভারেজ কমে গেলে দ্রুতই সংক্রামক রোগ ফিরে আসতে পারে।
পলিসি ব্রিফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এএমআর নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে সার্বজনীন শিশু টিকাদানের কভারেজ বজায় রাখা, এএমআর প্রতিরোধে কার্যকর টিকার প্রাপ্যতা বাড়ানো, জাতীয় এএমআর কৌশলে টিকাদানকে কেন্দ্রীয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, নিউমোকক্কাল কনজুগেট টিকার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন ও উন্নয়ন, টাইফয়েড কনজুগেট টিকা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা, রোটাভাইরাস টিকা চালু দ্রুততর করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও এএমআর নিয়ন্ত্রণ কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের বোঝা আরো বাড়তে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা/এমএসবি/এসবি
হাম ও এর উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু