ঢাকা     শুক্রবার   ২২ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪৩৩ || ৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাবিতে তথ্যপ্রাপ্তি যেন দুঃস্বপ্ন

আইন বলছে ২০ দিন, অথচ লাগে বছর

ই এম সৌরভ, ঢাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:২৫, ২২ মে ২০২৬   আপডেট: ১৬:৩২, ২২ মে ২০২৬
আইন বলছে ২০ দিন, অথচ লাগে বছর

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আবেদন করেও সময়মতো তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সাংবাদিকদের তথ্য দিতে দীর্ঘসূত্রতা, অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জনসংযোগ দপ্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের যেসব শিক্ষক এখনো স্বশরীরে ক্লাসে যোগদান করেননি এবং যেসব শিক্ষক নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে পলাতক বা ক্লাসে ফেরেননি, তাদের বিভাগভিত্তিক তালিকা’ চেয়ে আবেদন করেন বণিক বার্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মুহাইমিনুল ইসলাম। তবে প্রায় ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি প্রত্যাশিত তথ্য পাননি।

আরো পড়ুন:

মুহাইমিনুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলাম। দরখাস্ত জমা দেওয়ার পর তিন-চারবার গিয়েছি; কিন্তু কোথায় আটকে আছে কেউ বলতে পারে না। পরে তদন্ত কমিটির সদস্য আইয়ুব আলীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, এটা হয়তো হারিয়ে গেছে, আবার আবেদন দেন। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। মূলত তিনিই বিষয়টি আটকে রেখেছেন বলে আমি মনে করি।”

একইভাবে ঢাকা পোস্টের ঢাবি প্রতিনিধি সাদ আদনান রনি প্রায় সাত মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর দোকান কার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়টি হল থেকে তথ্য এসেছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, “দোকান বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির সম্ভাবনা থাকায় তথ্য গোপন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।”

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৯ অনুযায়ী, আবেদন পাওয়ার ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একাধিক ইউনিট সংশ্লিষ্ট থাকলে সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবস সময় নেওয়া যাবে। তথ্য দিতে অপারগ হলে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাওয়া নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ঢাবিতে মোট ১৫৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে সাংবাদিকদের আবেদন ৬৫টি, শিক্ষার্থীদের ৩১টি এবং শিক্ষকদের ৪টি।

নথি অনুযায়ী, ১৫৩টি আবেদনের মধ্যে ২০ দিনের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪টিতে। এক মাসের মধ্যে ১৪টি, দুই মাসে ১৫টি, তিন মাসে ৪টি, ছয় মাসে ৩টি এবং দুই বছরে ১টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ৪২টি আবেদন। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য সরবরাহের হার ৫৭ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সময়মতো তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার হার প্রায় ৪২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কাগজ ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করেন এই প্রতিবেদক। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ৩৯ দিন পর আংশিক তথ্য দেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ার কারণ লিখিতভাবে জানানো হয়নি।

এছাড়া, ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের দোকান, বাসা ও অন্যান্য এস্টেটের ১০ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে আবেদন করা হলেও প্রায় ১০ মাস পর আংশিক তথ্য দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট ম্যানেজার মিসেস ফাতেমা বিনতে মুস্তাফা বলেন, “আপনার রিপোর্ট আপনি করেন। যেহেতু দিতে পারিনি, এখন বলে লাভ কী? কর্তৃপক্ষ জবাব চাইলে আমরা জবাব দেব।”

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভবন নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করার পরও প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা দেয়নি। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. আক্রাম হোসেন বলেন, “আমি তথ্য অধিকার আইন পড়িনি। জানিও না, জানার চেষ্টাও করব না।”

তথ্য অধিকার আইনের ধারা ১৩, ২৪, ২৫ ও ২৭ অনুযায়ী, তথ্য না দিলে বা গড়িমসি করলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ, আপিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এমনকি প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে জরিমানার বিধানও আছে, যা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে বণিক বার্তার প্রতিনিধি মুহাইমিনুল ইসলাম বলেন, “আমি নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছি। কিন্তু প্রশাসনের গাফিলতির কারণে এখনো কোনো তথ্য পাইনি। তথ্য না পাওয়ায় সংবাদও করতে পারিনি। যারা স্বৈরাচারের দোসর, তারাই এসব তথ্য আটকে রেখেছে বলে আমি মনে করি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক রফিকুল ইসলাম পান্না বলেন, “আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নোট পাঠাই। অনেক তথ্য নিরাপত্তা, গোপনীয়তা বা বিচারাধীন বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর তথ্য দেয় না। তবে যেসব তথ্য আইনগতভাবে দেওয়া সম্ভব, সেগুলোর জন্য আমরা নিয়মিত তাগিদ দিচ্ছি।”

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবেদনকারীদের কোনো প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেওয়া হয় না, যা তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া, সরবরাহ করা তথ্যের পাতায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নও থাকে না।
এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম পান্না বলেন, “আমরা আইনের চেয়ে আন্তরিকতার জায়গাটিকে বেশি গুরুত্ব দিই।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম বলেন, “সাংবাদিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসঙ্গতি তুলে ধরতে কাজ করেন। কিন্তু অনেক অসাধু কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি তা প্রকাশ হোক চান না। এটি তথ্য অধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “যতটুকু সম্ভব তথ্য দেওয়ার জন্য আমরা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি।”

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা রক্ষা করে যেসব তথ্য দেওয়া সম্ভব, সেগুলো দেওয়া হবে। সবকিছু তো উন্মুক্ত নয়। তবে দোকান ও বাসার আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপনীয় কিছু নয়, এগুলো দেওয়া যেতে পারে।”

আবেদনের স্বীকারপত্র না দেওয়ার বিষয়ে অবগত হওয়ার পর তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি পিএসকে জানিয়েছি। তিনি এটি দেখবেন।”

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়