ঢাকা     শনিবার   ০৯ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৬ ১৪৩৩ || ২২ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

টক্সিক প্যারেন্টিং: গন্তব্য কোথায়?

মু.আবু মুসা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০২, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৪:২৪, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১
টক্সিক প্যারেন্টিং: গন্তব্য কোথায়?

একটু অন্যভাবে শুরু করি। টক্সিক প্যারেন্টিং সম্পর্কে মোটামুটি সবাই জ্ঞাত, যারা অজ্ঞাত তারা একটু গুগল করে এ সম্পর্কে জেনে নিলে ভালো হয়। টক্সিক প্যারেন্টিংয়ের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করাই আজকের আলোচনা। তবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। একটি গান সবসময় সব পরিস্থিতিতে আমাদের মনকে নাড়া দিয়ে যায়। সেই গানটি উল্লেখ না করলেই নয়।  

‘‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার।
নানান রকম জিনিস, আর আসবাব দামি দামি
সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আবার আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার এ ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।।’’

আরো পড়ুন:

বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করা এ গানটি শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নচিকেতার গাওয়া এ গানটি শুধু ভারতবর্ষ নয় বাংলাদেশেও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে এবং তার পরিচিতি বাড়িয়েছে বহুগুণ। 

আধুনিক এই যুগে অনেকেই বৃদ্ধাশ্রমকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে রাজী নন, তাদের মতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় সমগ্রবিশ্বে বৃদ্ধদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে বৃদ্ধাশ্রম বা ‘ওল্ড এজ হোম’।  বাংলাদেশও এর থেকে ব্যাতিক্রম নয়।  বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রবীণ, বৃদ্ধ সাধারণত পরিবারে বাস করেন। তবে  সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে দিন দিন, ফলে প্রবীণদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার তথা আশ্রয় এবং বাসস্থানের অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এবং এই পুরো বিষয়টি তারা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন। 

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই বৃদ্ধদের আশ্রমে রাখার বিষয়টি এখনো নেতিবাচক হিসেবেই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধ তথা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখাটা তো মহা অন্যায় হিসেবে দেখা হয়। তবুও কমছে না বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা, বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনসংখ্যার পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রম বাড়ছে। 

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু বৃদ্ধাশ্রম উলম্ব গতি কেন? শুধুই কি আধুনিকায়ন, নাকি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ। বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে আলোচনার শুরুতেই আমাদের অনেকে নাক সিটকান, সন্তানের নেতিবাচক মনোভাব, নৈতিক শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক অভাব তুলে ধরেন। হ্যাঁ, এটা সত্যই যে খুব দ্রুত একটা যুগের পরিবর্তন হচ্ছে, যুগ না যেন শতাব্দির পরিবর্তন। শিক্ষার অভাব না থাকলেও নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষার অভাব স্পষ্টত প্রতীয়মান। তবে অনেক শিক্ষিত, মার্জিত পরিবারের প্রবীণরাও তো বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। 

ধরা যাক, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত প্রবীণ নিবাসের (বৃদ্ধাশ্রম) বৃদ্ধা মিরা চৌধুরীর কথা। জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এই বৃদ্ধা মূলত খুলনার একটি কলেজের শিক্ষক, তার স্বামী জোসেফ চৌধুরী ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) ডিরেক্টর। তার একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে উচ্চতর শিক্ষা নিতে বিদেশ পাড়ি জমান, কিছু দিন পরই স্বামী মারা গেলে সুখের সংসারে ঘনকালো অন্ধকার নেমে আসে। অন্ধকার আরো ঘনীভূত হয় যখন তিনি শুনলেন, তার আদরের সন্তান বিদেশেই একটি ব্যাংকে চাকরি পেয়ে সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপায় না পেয়ে এখন ঢাকাস্থ বাড়ি বিক্রি করে হলেও প্রবীণ নিবাসে উঠেছেন।  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (অবসর প্রাপ্ত) ড. আব্দুল আউয়াল (৭০) ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। দীর্ঘ ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন সুনামের সঙ্গে। ২০০৬ সালে অবসর নেন। সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিন সন্তানের মধ্যে বড় রোজিনা ইয়াসীন আমেরিকা প্রবাসী। এরপর বড় ছেলে উইং কমান্ডার (অব.) ইফতেখার হাসান। ছোট ছেলে রাকিব ইফতেখার হাসান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। জীবনে এত কিছু থাকার পরও আজ তার দু’চোখে অন্ধকার। থাকেন আগারগাঁও প্রবীণ নিবাসে।  এমন হাজারো উদাহরণ আছে, সন্তানের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, সম্পত্তি লিখে দিয়ে সন্তানের থেকে প্রতারিত হওয়া পিতামাতাও এ তালিকা থেকে বাদ যান না।

কিন্তু আধুনিক এই যুগে প্রবীণদের ব্যাপারে সবাই কমবেশি সচেতন। অন্তত অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাদীক্ষা ঘটিত কারণে প্রবীণদের প্রবীণ নিবাসে আসার হার কমেছে। অদূর ভবিষ্যতে আরো কমবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তবে, এরপরেও  এমন কিছু পিতামাতা আছেন বা থাকবেন, যারা শেষ বয়সে প্রবীণ নিবাসে যাচ্ছেন, যেতে বাধ্য হচ্ছেন, হবেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, তাদের নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতেই পরিবার থেকে বিতাড়িত বিশেষ করে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হচ্ছে। বর্তমান সময়ের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘টক্সিক প্যারেন্টিং’। টক্সিক প্যারেণ্টিং বলতে অনেকে শুধু তরুণ প্রজন্মভিত্তিক বা কিশোর তরুণদের প্রতি বাবা মায়ের অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগকেই বোঝেন। অথচ ব্যাপারটি এমন নয়। টক্সিক প্যারেন্টিং বিষয়টি আমাদের সাথে হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।  কিশোর তরুণদের ছাড়াও টক্সিক প্যারেন্টিং খুঁজতে গেলে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এক প্রকার বৃদ্ধ/বৃদ্ধা রয়েছেন, যারা অযথা সন্তান ও পুত্রবধূর সাথে কলহে লিপ্ত হন। বিনা কারণে এবং সেকেলে ধ্যান-ধারণা বজায় রাখতে গিয়ে নিজের শিক্ষিত-মার্জিত পুত্র ও পুত্রবধূর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে দিন দিন নিজের বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার পথকে সুগম করেন। 

সালেহা বেগম (ছদ্মনাম) বিধবা হয়েছেন ২০ বছর আগে, তার সন্তানদের মধ্যে বড় ছেলে যখন কলেজ পড়ছে, এমতাবস্থায় তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। অকূলপাথার পাড়ি দিয়ে আজ তার প্রতিটি সন্তানই প্রতিষ্ঠিত। ৫ সন্তানের সবাই প্রতিষ্ঠিত হলেও কোনো সন্তানের কাছেই ঠাঁই পাচ্ছেন না তিনি। তার কাজই যেন পুত্রের সাথে পুত্রবধূর ঝগড়া বাঁধিয়ে দেওয়া। অথচ তার সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে মানুষ হওয়া তার সন্তানেরা কেউই তাকে দূরে রাখতে না চাইলেও বাধ্য হয়েই নিজ বাসা থেকে অন্য সন্তানের বাসায় পাঠাতে কার্পণ্য করেন না।

তার ভবিষ্যৎ অনুমেয়। এভাবে, কোনো কোনো পিতা আছেন, যারা স্বৈরাচারতন্ত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এসব পিতা-মাতারা ভুলে যান যে একটা নির্দিষ্ট সময় পরে সাংসারিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সন্তানদের মতামত নেওয়া জরুরি। সন্তানদের সংশ্লিষ্টতা থাকা দরকার। কিন্তু দেখা যায়, তারা সন্তানের কোনো পরামর্শ জানতেই চান না, নেওয়া তো দূরে থাক। সন্তানরা অনেক সময় সার্বিক বিষয় বিবেচনায় রেখে কোনো পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করলেও নিজের সেকেলে ধ্যান-ধারণা অটুট রাখতে তারা যেন বদ্ধপরিকর। ফলে সন্তানের মনে একটা দূরত্ব তৈরি হয়, এভাবে দূরত্ব বাড়তেই থাকে এবং এক পর্যায়ে সন্তানরা বাবা-মাকে নিজের জীবনের অংশ মনে করতে ভুলে যান। সন্তানের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানরা যেন যত্নবান হন, এই শিক্ষাও বাবা-মাকেই দিতে হবে। আর এসব শিক্ষা শুধু বুলি আওড়িয়ে নয়, বাস্তবতার নিরিখে শেখানো উচিত। নইলে সন্তানের বিপথগামীতা তো নির্ণেয়ই, সাথে নিজেদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ। 

এভাবে প্রতিটি অভিভাবকের তার সন্তানের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা উচিত, যাতে কোনোভাবেই বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে না পারে। সম্পর্কের মধ্যে কোনো নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে না পারে। কারণ, শেষ জীবনের গ্লানি সহ্য করা কতটা কষ্টের, তা প্রতিটি বৃদ্ধাশ্রমের জানালায় দাঁড়ানো প্রবীণদের ছানিপড়া আদ্র চোখের জলই বলে দেয়। তখন সময় থাকে না শোধরানোর, সুযোগ থাকে না ফিরে আসার। 

রঙিন এই জীবনের চেয়েও মৃত্যু কামনাই যেন তখনকার একমাত্র উপায় ও আশ্রয়স্থল মনে হয়। কেউই এমন জীবন কামনা করে না, যে জীবনে হতাশা, গ্লানি, তাচ্ছিল্যতা একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠবে। ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ছড়িয়ে যাক বিশ্বময়, টক্সিক প্যারেন্টিং আর নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা/মাহি 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়