ইফতারে সম্প্রীতির উষ্ণতায় ইবির আইন-৩৪ ব্যাচ
ইবি সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
বিকেল গড়িয়ে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন নতুন রূপ নেয়। কেউ আবাসিক হল থেকে প্লাস্টিকের মাদুর হাতে ছুটছেন কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের দিকে, কেউ হলের ডাইনিং থেকে বড় গামলা ভর্তি মুড়ি-ছোলা নিয়ে আসছেন। কেউবা বাজার থেকে কেনা খাবার নিয়ে সবুজ ঘাসে বসে পড়ছেন দল বেঁধে। এ আয়োজন কেবল ক্ষুধা নিবারণের নয়; বরং হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্বের সুতোয় বাঁধা তারুণ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।
আইন বিভাগের ৩৪তম ব্যাচের ২০ উদ্যমী শিক্ষার্থী এ আয়োজনে যোগ করেছেন ভিন্ন মাত্রা। মেধাবী সহপাঠীর পাশে এক ব্যাকবেঞ্চার, জুনিয়রের পাশে সিনিয়র, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের পাশে ক্যাম্পাসের ভ্যানচালক মামা, আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুও একই সারিতে বসে ইফতারে অংশ নেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শ্রেণিবৈষম্যহীনতার এ দৃশ্যই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় ৩৮ দিনের ছুটিতে থাকলেও অনেকের বাড়ি ফেরা হয়নি। ব্যাচের প্রায় আঠারোজন শিক্ষার্থী আবাসিক হল, মেস কিংবা কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ শহরে অবস্থান করছিলেন। ব্যস্ততার একঘেয়েমি কাটাতে শিক্ষক-সহপাঠীদের নিয়ে ইফতারের পরিকল্পনা করা হয়। বন্ধু রিয়াদকে ইনবক্সে প্রস্তাব দেওয়া মাত্রই সাড়া মেলে। পরে করিমসহ অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শুরু হয় প্রস্তুতি। সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ক্রিকেট মাঠে আয়োজন করা হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—ইফতার।
কেউ কুষ্টিয়া থেকে, কেউ ঝিনাইদহ, কেউবা মাগুরা থেকে ছুটে আসেন অংশ নিতে। হলের শিক্ষার্থীরা কাছের বাজার থেকে ইফতারসামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন নির্ধারিত স্থানে। বিভাগের সবার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাহজাহান মন্ডল ইফতারে যোগ দিয়ে মোনাজাতের আহ্বান জানান। বন্ধু আসাদ দোয়া পরিচালনা করেন। ইফতারের আয়োজনে ছিল দই-চিড়া, খেজুর, কলা, আপেল, বড়ই, আঙুর, জিলাপি ও শরবত।
ক্যাম্পাসে ইফতারের এ গণ-সংস্কৃতি নতুন নয়। একসময় যা হলের ডাইনিং বা মসজিদের বারান্দায় সীমাবদ্ধ ছিল, গত এক দশকে তা ছড়িয়ে পড়েছে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। কেন্দ্রীয় ক্রিকেট ও ফুটবল মাঠ, ডায়না চত্বর, ঝাল চত্বর, আমতলা, বটতলা, হলপাড়া, জিমনেসিয়াম মাঠ কিংবা জিয়া মোড়—সবখানেই ছোট-বড় পরিসরে দেখা যায় ইফতারের আয়োজন। সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র, শিক্ষক এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে এটি পরিণত হয়েছে সম্প্রীতির উৎসবে। সংযম, ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা যেমন মেলে, তেমনি সাম্য ও সহমর্মিতার চর্চাও হয় সমানতালে।
ইফতার শেষে অনেকে কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ আদায় করে প্রধান ফটকের সামনে চায়ের দোকানে আড্ডায় মেতে ওঠেন। দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়া সেই খোশগল্পে আরো দৃঢ় হয় পারস্পরিক বন্ধন।
সহপাঠী শ্রাবণ বিশ্বাস বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, প্লেট বদল করে খাওয়া কিংবা কারো দেরিতে এসে যোগ দেওয়া, সব মিলিয়ে সময় যেন চোখের পলকে কেটে গেছে। ক্লাসের বেঞ্চ, চায়ের আড্ডা, পরীক্ষার আগের রাতের উদ্বেগ, এসবের মাঝেই যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, এ ইফতার যেন তারই নীরব উদযাপন। সামনে হয়তো সবার পথ আলাদা হবে, তবু এ বিকেল স্মৃতিতে থাকবে উষ্ণ রোদ হয়ে।”
সোলায়মানের ভাষ্য, এ ইফতার ছিল সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য প্রকাশ। রমজানের পবিত্র আবহে একসঙ্গে বসে ইফতার করার মুহূর্তগুলো সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। শেষ বিকেলের প্রতীক্ষা, আজানের ধ্বনি আর প্রাণখোলা আড্ডা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে হৃদয়ছোঁয়া এক স্মৃতি, যা ভবিষ্যতের পথচলায় শক্তি জোগাবে।
ক্যাম্পাসের ইফতার তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি এক টুকরো বাংলাদেশ। সহনশীলতার শিক্ষা, ত্যাগের চর্চা ও ভ্রাতৃত্বের বিকাশ, সব মিলিয়ে এটি তারুণ্যের এক অনন্য উৎসব। আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলে এবং অসংখ্য তরুণ একসঙ্গে রোজা ভাঙলে যে প্রশান্তি নেমে আসে, তা হয়ে থাকে সম্প্রীতির উজ্জ্বল প্রতীক। এই সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে—জয় হোক তারুণ্যের মৈত্রীর, জয় হোক সম্প্রীতির।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্রিকেট ও ফুটবল মাঠ, ডায়না চত্ত্বর, ঝাল চত্ত্বর, আমতলা, বটতলা, হল পারার ছোট্ট ছোট্ট দোকান, জিমনেসিয়ামের মাঠ, জিয়া মোড়ের বিভিন্ন স্থানে স্বল্প পরিসরে ইফতার করতে দেখা যায়। এতে সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র, শিক্ষক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে গড়ে উঠে সম্প্রীতির এক মিলনমেলা। যার মূলে আছে বাঙালি সংস্কৃতির সেই চিরচেনা ইফতার। যেখানে সকলের আন্তরিকতার ছোঁয়া ও অমায়িক ব্যবহারে ক্যাম্পাস হয়ে উঠে প্রশান্তির নীড়। বৈচিত্র্যময় ইফতার টেবিলে হাসি-আড্ডা আর ভাগাভাগির উষ্ণতায় প্রতিদিনের এই আয়োজন যেন ক্যাম্পাস জীবনে যোগ করে উৎসবের নতুন মাত্রা। যেখানে সংযম, ধৈর্য ও ত্যাগের পাশাপাশি ফুটে উঠে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার ছবি।
সহপাঠী শ্রাবণ বিশ্বাস বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে বসে হাসাহাসি, ঠাট্টা, প্লেট বদল করে খাওয়া, কারো দেরি করে আসা। সব মিলিয়ে মনে হলো, সময়টা কত দ্রুত চলে গেল! ক্লাসের বেঞ্চ, চায়ের দোকানের আড্ডা, পরীক্ষার আগের রাতের দুশ্চিন্তা। এসবের মাঝেই গড়ে উঠেছিল যে বন্ধুত্ব, আজকের ইফতার যেন তারই এক নীরব উদযাপন। হয়তো সামনে সবাই আলাদা পথে হাঁটবে, কিন্তু এই শেষ ইফতারের বিকেলটা, আজীবন মনে থাকবে এক টুকরো উষ্ণ রোদ হয়ে।
সোলায়মান যোগ করে বলেন, “আজকের বন্ধুদের ইফতার ছিল গভীর সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রকাশ। রমজানের পবিত্র আবহে একসাথে বসে ইফতার করা যেন আমাদের সম্পর্কের বুনিয়াদকে আরও দৃঢ় ও অর্থবহ করে তুলল। শেষ বিকেলের প্রতীক্ষা, আজানের ধ্বনি আর প্রাণখোলা আড্ডা, সব মিলিয়ে গড়ে উঠল হৃদয়ছোঁয়া এক মিলনমেলা। পড়াশোনার অধ্যায় প্রায় শেষ। সামনে নতুন পথের আহ্বান। তাই আজকের এই সময়গুলো নিছক একটি সন্ধ্যা নয়, এগুলো হয়ে থাকবে আমাদের বন্ধুত্ব ও যৌথ স্মৃতির অমূল্য চিহ্ন।”
ক্যাম্পাস ইফতার কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক টুকরো বাংলাদেশ। এখানে শিক্ষা মেলে সহনশীলতার, চর্চা হয় ত্যাগের আর বিকাশ ঘটে ভাতৃত্বের। যখন আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় এবং হাজার হাজার তরুণ একসাথে পানি মুখে দিয়ে রোজা ভাঙে, তখন সেখানে এক অপার্থিব প্রশান্তি নেমে আসে। এই সংস্কৃতি বেঁচে থাক যুগ যুগ ধরে, জয় হোক তারুণ্যের মৈত্রীর, জয় হোক আইন-৩৪ ব্যাচের, জয় হোক সম্প্রীতির।
ঢাকা/তানিম/জান্নাত