ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৮ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৪ ১৪৩৩ || ২ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

তুহিন সাইফুল ইসলাম  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩৯, ১৮ জুন ২০২৬  
রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য এই রাজস্ব সংগ্রহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। 

আরো পড়ুন:

তবে অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ মনে করছে, বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই বিপুল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।

তাদের মতে, গত কয়েক বছরের রাজস্ব আহরণের বাস্তব চিত্র, কর-জিডিপি অনুপাতের নিম্ন অবস্থান, কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে না। ফলে বাজেটের অনেক লক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

রাজস্ব সংগ্রহ কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় বাজেটের মূল ভিত্তিই হলো রাজস্ব আয়। সরকার যে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করবে কিংবা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করবে—এসবের বড় অংশের অর্থ আসে কর ও শুল্ক থেকে।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হয়। এতে ঋণের চাপ বাড়ে এবং ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে বাজেট বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম দিচ্ছে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে।

এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।”

তার মতে, চলমান কর ও রাজস্ব সংস্কারের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না; বাস্তব ফল পেতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। ফলে রাজস্ব আদায়ে যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা অর্জন কঠিন হবে। 

তিনি বাজেটকে সামগ্রিকভাবে উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থনৈতিক চাপের সময়ে এত বড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসবে।

তিনি মনে করেন, যখন পূর্ববর্তী লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব হয়নি, তখন নতুন অর্থবছরে আরো বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই রাজস্ব বাড়ে না; এর জন্য কর প্রশাসনের সক্ষমতা, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও উদ্বেগের কারণ। অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর-জিডিপি অনুপাতকে উল্লেখ করে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। 

দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই হার তুলনামূলক কম।

দেশে অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আদায় বাড়ছে না। বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। ফলে একই শ্রেণির করদাতাদের ওপর বারবার করের চাপ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়।

গত সপ্তাহে সংসদে বাজেট প্রস্তাবনা দেওয়ার পর, বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ গণমাধ্যমগুলো করের আওতা বাড়ানোর বিষয়ে মত দিয়েছেন। এদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন কর আরোপের পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানোই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।তবে করের আওতা বাড়ানোও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অনেক নাগরিকের টিআইএন থাকলেও তারা নিয়মিত কর রিটার্ন দাখিল করেন না। আবার বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এখনও কার্যকর কর নেটের বাইরে রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেজের সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন করদাতা শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে, ব্যবসায়ী নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর চাপ শেষ পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পড়তে পারে।

তাদের মতে, নতুন করদাতা যুক্ত করার পরিবর্তে যদি বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকেই বেশি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দাম এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর।

তারা কর প্রশাসনকে আরো সহজ, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, স্বেচ্ছায় কর পরিশোধে উৎসাহ বাড়াতে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যবসার সংগঠন এফবিসিসিআই, বাজেটকে বাস্তবায়নযোগ্য বলে অভিহিত করলেও রাজস্ব আহরণ ও বাজেট বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংগঠনটির মতে, স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

এদিকে, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। 

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও চাহিদা সংকোচনের মুখে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত করের চাপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরো মন্থর করতে পারে। ফলে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে।

রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করাও সমান জরুরি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডাইলগের বাজেট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, অতীতের তুলনায় অনেক বেশি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কর প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। আর সেখানে মূল্যস্ফীতি এখানে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আসতে পারে। 

তাদের মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ছাড়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনের জন্য ডিজিটাল রূপান্তরের বিকল্প নেই। ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, অনলাইন অডিট এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক কর ব্যবস্থাপনা চালু হলে কর ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য সেবা গ্রহণও সহজ হবে।

এদিকে, রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে শুল্কনির্ভরতা কমানোর পরামর্শও দিচ্ছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। 

বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে অনেক ধরনের বাণিজ্য সুবিধা কমে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে প্রত্যক্ষ কর থেকে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে আয়কর ও করপোরেট করের ভূমিকা বেশি হলেও বাংলাদেশ এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের মতে, একটি আধুনিক ও টেকসই রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলতে হলে এই ভারসাম্য পরিবর্তন করতে হবে।

সেক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে সরকারের জন্য, সিপিডি সহ বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের বাজেট বিশ্লেষণে বলেছে, শুধু করহার পরিবর্তন বা নতুন খাতে কর আরোপের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

কর প্রশাসনের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অটোমেশন সম্প্রসারণ এবং করদাতা সেবার মান উন্নয়নের মতো পদক্ষেপকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

অর্থনীতি নিয়ে এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করছে, রাজস্ব ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা বাড়ানো গেলে স্বেচ্ছায় কর প্রদানের সংস্কৃতিও শক্তিশালী হবে। তবে সামনে এজন্য দিতে হতে পারে কঠিন পরীক্ষা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মতো একাধিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত রাজস্ব।

বাজেটের সফলতা শেষ পর্যন্ত অনেকাংশে নির্ভর করবে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর। যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ সম্ভব না হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যয় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়া কিংবা ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রাজস্ব সংগ্রহে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং করের আওতা সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী বাজেটের অনেক লক্ষ্যই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, “বাজেট বাস্তবায়নের জন্য লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাস্তবসম্মত হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। লক্ষ্য বাস্তবসম্মত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনেও সতর্ক করে বলেছেন, “রাজস্ব আহরণের নজিরবিহীন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে পুরো বাজেটই চাপের মুখে পড়বে। তার মতে, ব্যয় পরিকল্পনা ও রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয় না থাকলে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

তিনি বাজেট বাস্তবায়নে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেন।

ঢাকা/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়