সেই ‘তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব সংরক্ষণে শেরপুরে প্রতিবাদী প্রদর্শনী
শেরপুর প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
আলোকচিত্রী নীতীশ রায়ের ক্যামেরায় তোলা ছবি ‘তৃষ্ণা’
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী, শেরপুরের কৃতিসন্তান প্রয়াত নীতিশ রায়ের ‘তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব সংরক্ষণে প্রতিবাদী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিকালে শেরপুরে শহরের চকবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ‘তৃষ্ণা’ ছবির নারী কুমুদিনী কোচ ও তার শিশুকন্যা রিতা কোচকে নিয়ে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি জেলা পরিষদ প্রশাসক অধ্যক্ষ এ.বি.এম. মামুনুর রশীদ পলাশ।
এসময় সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতায় যুব জাগরণে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেরপুরের তরুণদের গানের দল ‘ভাবেরতরী’ গান পরিবেশন করে। স্থানীয় শুভাকাঙ্খী, আইইডি ও সহভাগী সংগঠনের সহায়তায় নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটি এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
‘তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব সংরক্ষণে প্রতিবাদী প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক সমাজকর্মী রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, শিল্পী তৃপ্তি কর, আইনজীবী মোখলেছুর রহমান জীবন, সাংবাদিক উৎপল কান্তি ধর প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ‘তৃষ্ণা’ ছবির মা-মেয়ে কুমুদিনী কোচ ও রিতা কোচকে সম্মাননা ও উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। এ উপলক্ষে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সুভ্যেনির প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়।
শেরপুরে গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধিগাঁও এলাকার নারী কুমুদিনী কোচ বাবার অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে আড়াই মাস বয়সি শিশুকন্যা রিতা কোচকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে পিঠে বেঁধে নিয়ে নকশী এলাকার বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে কালাঘোষা পাহাড়ি নদীর ঝরা থেকে দু’হাত দিয়ে পানি পান করে তৃষ্ণা মিটান। আর তখন শিশুকন্যাটি মায়ের দুধ পান করতে থাকে। ১৯৮১ সালের দিকে চিরন্তন এই অপরূপ দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন শেরপুর শহরের নয়ানি বাজারের বাসিন্দা আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক নীতিশ রায়। সাদা-কালো ‘তৃষ্ণা’ শিরোনামের ছবিটি ১৯৮২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার লাভ করে।
‘তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব সংরক্ষণে প্রতিবাদী প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য
শিল্প-চেতনা সমৃদ্ধ আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ২০১৭ সালের ৮ জুন ৭৫ বছর বয়সে মারা যান। পরবর্তীতে তার স্ত্রী কবি সন্ধ্যা রায়ও মারা যান। মনের তাগিদে ভালো ছবি ক্যামেরাবন্দি করার মানসে পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো নিঃসন্তান নীতিশ রায় ফ্রেমবন্দি করেন মুক্তিযুদ্ধসহ অনেক দূর্লভ ও শৈল্পিক মুহূর্ত। সম্প্রতি নীতিশ রায়ের ‘তৃষ্ণা’ ছবিটিকে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং নিজের দাবি করে দু’জন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলে, শেরপুরের সচেতন মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারই প্রতিবাদে প্রয়াত আলোকচিত্রী নীতিশ রায়ের আন্তর্জাতিব পুস্কারপ্রাপ্ত ‘তৃষ্ণা’ ছবির স্বত্ব সংরক্ষণে প্রতিবাদী প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে নীতিশ রায়ের তোলা ‘তৃষ্ণা’সহ ৩০টি ঐতিহাসিক ও দুর্লভ ছবি প্রদর্শিত হয়।
‘তৃষ্ণা’ ছবির নারী কুমুদিনী কোচের বয়স এখন ৬৬ বছর। বাড়ি ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গান্ধিগাঁও গ্রামে। পাহাড়ি টিলায় ১৭ শতক জমির ওপরে তার বসবাস। কুমুদিনী কোচ বলেন, “বাপের অসুস্থতার খবর পাইয়া তিন মাসের রিতাকে পিঠে নিয়া নওকুচি বাপের বাড়ি যাইতেছিলাম। ঝরার পানিতে পিপাসা মিটাই। তখন যে নীতীশ দাদা ছবি তুলছে, বুঝিই নাই।”
আলোকচিত্রী নীতীশ রায়ের ক্যামেরায় তোলা ছবি
ইউনেস্কোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে ১৯৮২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করে ‘তৃষ্ণা’ ছবি। একই বছরের ৬ আগস্ট নীতীশ রায়ের ছবিসহ আলোকচিত্রটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নীতীশ রায় একাধারে একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি।
ঢাকা/তারিকুল/শান্ত