ঢাকা, বুধবার, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১৩ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

এ যুগের ভিস্তিওয়ালা

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৮ ৮:১৯:২৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৮:১৯:২৪ এএম

‘ভিস্তিওয়ালা নাজিম’-এর কথা মনে আছে? যিনি চৌসার যুদ্ধে শের শাহ্’র আক্রমণে গঙ্গায় ডুবতে যাওয়া সম্রাট হুমায়ুনের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। বদৌলতে তিনি হয়েছিলেন দিল্লির একদিনের সম্রাট। ভিস্তিওয়ালাদের ‘ভিস্তি আবে ভিস্তি’ হাঁকে এক সময় ঢাকা, কলকাতা কিংবা দিল্লির রাস্তা মুখরিত থাকত। সময়ের পরিক্রমায় সেই হাঁক আর শোনা যায় না। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সেই পেশা এবং ভিস্তিওয়ালারা। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে- গত শতাব্দির বিশের দশকের মাঝামাঝি ঢাকার রাস্তাতেও ভিস্তিওয়ালার আনাগোনা ছিল।

ভিস্তি অর্থ পানি বয়ে নিয়ে যাবার জন্য ব্যবহৃত চামড়ার থলি। শব্দটি এসেছে পার্সি ‘ভেস্ত’ বা ‘বেহস্ত’ থেকে; যার অর্থ স্বর্গ। কারবালার প্রান্তরে যুদ্ধের মধ্যে পানি বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসেন (রা.) তীরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে স্বর্গলাভ করেন। সেই ঘটনা থেকেই এমন নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়। কালো চামড়ার বালিশের মতো ‘মশক’ ভরে যারা পানি দিয়ে যেত তাদের বলা হতো ভিস্তি। অনেকে ভিস্তিওয়ালাও বলতেন। বিংশ শতকের প্রথম কয়েক দশক এই পেশার প্রচলন ছিল।

‘দ্য লাস্ট ওয়াটারম্যান’ হিসেবে ভিস্তিওয়ালারা ইতিহাসখ্যাত। এদের ফারসিতে বলা হতো ‘সাক্কা’। পুরান ঢাকার সিক্কাটুলীতে ছিল তাদের বাস। সাক্কা থেকেই যে সিক্কাটুলী বুঝতে অসুবিধা হয় না। দিল্লিতেও এই পেশাজীবীরা ছিলেন। সেখানেও রয়েছে সাক্কেওয়ালী গলি। থ্যাবড়া নাক, মাথায় কিস্তি টুপি ও মিশমিশে  কালো চাপ দাড়িওয়ালা ভিস্তির সন্ধান সাহিত্যেও পাওয়া যায়। শামসুর রাহমানের ‘স্মৃতির শহরে’ তাদের উল্লেখ রয়েছে। রবীন্দ্র ও সুকুমার সাহিত্যেও রয়েছে তাদের উপস্থিতি।

পুরনো ঢাকায় ভিস্তিওয়ালাদের বেশ প্রভাব ছিল। আলাদা পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় তারা থাকতেন। পঞ্চায়েত প্রধানকে বলা হতো ‘নবাব ভিস্তি’। জিন্দাবাহার চৌধুরী বাড়ির জমিদারকন্যা আমেতুল খালেক বেগম ভিস্তিওয়ালাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন: ‘সকাল বেলা ভিস্তি আসত বিরাট মশকে ভরে পানি কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে।... ভিস্তির সেই বিকট গলা। মশকের মুখটা খুলে চেপে ধরে কলসিতে পানি ঢেলে রাখত। বিরাট সেসব কলসি, মাটির মটকায়ও পানি রাখা হতো।... ভিস্তিওয়ালাদের ব্যাগগুলো ছিল চামড়ার। ব্যাগগুলো তৈরি হয় মূলত ছাগলের চামড়া দিয়ে।’

‘কোম্পানী আমলে ঢাকা গ্রন্থ’ থেকে জানা যায়, ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট হেনরি ওয়াল্টারস তাঁর ১৮৩০ সালের আদমশুমারি ‘সেনসাস অব দ্য সিটি অব ঢাকা’য় মুসলমানদের যে পেশাভিত্তিক তালিকা তৈরি করেছিলেন, তাতে ১০টি ভিস্তি গৃহের উল্লেখ রয়েছে। ভিস্তিরা ছিলেন সুন্নি ধর্মাবলম্বী। সুন্নি হওয়া সত্ত্বেও সেকালে মহররমের মিছিলে রাস্তার দুই পাশে প্রতীক্ষারত ও রৌদ্রক্লান্ত দর্শকদের মধ্যে পানি বিতরণ করতেন ভিস্তিরা।

ঢাকাকেন্দ্রের পরিচালক আজিম বক্শ ভিস্তিদের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল-দুপুর তারা পিঠে পানিভর্তি চামড়ার ঢাউশ ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় পানি ছিটাত, যাতে ধুলা না ওড়ে। তাদের কাঁধে ঝুলানো থাকত ছাগলের চামড়ার মশক। এই মশক দিয়েই টাকার বিনিময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা পানি সরবরাহ করত। ষাটের দশক পর্যন্ত ছিল তাদের কর্মকাণ্ড। তারপর হারিয়ে যায়।’

পরে ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ পানির অপ্রতুলতার প্রতি খেয়াল রেখে নবাব খাজা আবদুল গণি ১৮৭৪ সালে চাঁদনীঘাটে ওয়াটার ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠার জন্য দুই লক্ষ টাকা চাঁদা প্রদান করেন। তাঁর এই বদান্যতায় ১৮৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভায় গড়ে ওঠে ঘরে ঘরে পানি সরবরাহের আধুনিক সুবিধা। আরো পরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হলে নগরবাসীর নিরাপদ পানির চিন্তা দূরীভূত হয়। এর সঙ্গে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় ভিস্তিদের পেশাদারী জীবন। আবেদন কমতে থাকে ভিস্তিওয়ালাদের। তারাও বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় নিজেদের জড়িয়ে নেন। তবে কলকাতায় আজো ভিস্তিওয়ালাদের চোখে পড়ে।

ঢাকার দিন বদলেছে। তবে আধুনিক ঢাকায় এখন আছে আধুনিক ভিস্তিওয়ালা। তারা পাইপলাইনে বাড়ি বাড়ি পানি দেন কিংবা পানি সরবরাহ করেন। এখন ভিস্তির ব্যবহার নেই, তবে পানি সরবরাহের কাজটি কিন্তু ঠিকই আছে। সদরঘাট, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলীর লোকজন পানি সরবরাহকারীদের ‘ভারওয়ালা’ বলেন। তারা পানি ভর্তি টিনের জার ভারে বহন করেন। ওয়াইজঘাটের বুলবুল ললিতকলা একাডেমির (বাফা) পাশে রয়েছে ছোট্ট একটি কল। এখান থেকে ভারওয়ালারা পানি নিয়ে পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর, সদরঘাটের দোকানগুলোতে সরবরাহ করেন।

পাত্র ভেদে ভারওয়ালারা পানির দাম পান। আবার মাসিক চুক্তিতেও তারা পানি সরবরাহ করেন। সূত্রাপুরের হেমেন্দ্র দাস রোডের একটি পানির কলে দেখা গেল সারি ধরে কলস রাখা হয়েছে। অথচ আশপাশে কেউ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সরবরাহ নলে পানি আসে দুপুর ১২টার পর। সে সময় একটা একটা করে কলস ভরা হয়। সেগুলো পৌঁছে দেয়ার কাজ করেন কলসওয়ালারা। আবার নগরের বাজারগুলোয় রয়েছে পানি সরবরাহের হাঁড়িওয়ালা। তাদের কাজ বাজারের মাছ আর সবজি বিক্রেতাদের কাছে পানি সরবরাহ করা। তেমনই একজন মতিন মিয়া। টিনের পাত্রে ভার দিয়ে পানি সরবরাহ করেন। প্রতি টিন পানির দাম ৫ টাকা।

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন