ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ইতিহাসে অমর ব্যক্তিত্ব রণদাপ্রসাদ সাহা

জাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৯ ৩:২৫:০৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৯ ৩:২৫:০৫ পিএম

রণদাপ্রসাদ সাহা বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের কাছুর গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ সাহা পোদ্দার এবং মাতার নাম কুমুদিনী দেবী। পৈতৃক নিবাস টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত তিনি সেখানেই লেখাপড়া করেন। তাঁর পিতা দরিদ্র ছিলেন। তাঁর বয়স যখন সাত বছর, তখন সন্তান প্রসবকালে মা ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর পিতা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। বিমাতার আশ্রয়ে বহু দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে রণদা’র শৈশবকাল অতিবাহিত হয়।

দারিদ্র্য আর সীমাবদ্ধতায় মাকে হারানোর পর ভেঙে পড়লেও থমকে জাননি রণদাপ্রসাদ সাহা। এ সময় গতিময় জীবনের শহর কলকাতা চলে যান তিনি। সেখান থেকে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে জেলও খাটতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। ৪৯ বেঙ্গল ইনফ্যান্ট্রির ভাইসরয় কমিশন্ড অফিসার রণদাপ্রসাদ সাহার সাথে সখ্য গড়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের। যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সম্রাট ৫ম জর্জ ইংল্যান্ডে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করেন। দেশে ফেরার পর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অভিনন্দন জানান।

যুদ্ধের পর রেলওয়েতে চাকরি নেন রণদাপ্রসাদ। এরপর বেঙ্গল রিভার্স সিস্টেম গড়ে তোলেন। যেখানে সম্পৃক্ত ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়। এছাড়া পূর্ববঙ্গের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র পরিচালনা করেন তিনি। প্রখর মেধাবী রণদাপ্রসাদের পরবর্তী জীবন উত্থানে ভরা। ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা দিয়ে একদিকে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, আরেক দিকে সম্পদ দান করেছেন মানুষের জন্য, মানবতার জন্য। দারিদ্র্যের কারণে মাকে হারানো রণদাপ্রসাদ সাহা শৈশবেই পণ করেছিলেন মায়ের জন্য, মায়ের নামে কিছু একটা করবেন। অবশেষে ১৯৩৮ সালে মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি এশিয়ার বৃহত্তম ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত বেসরকারি হাসপাতাল।

১৯৪২ সালে তার প্রপিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামে ‘ভারতেশ্বরী বিদ্যাপীঠ’ স্থাপন করে ঐ অঞ্চলে নারীশিক্ষার সুযোগ করে দেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম বদলে ১৯৪৫ সালে ভারতেশ্বরী হোমস রাখা হয়। তিনি ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইলে কুমুদিনী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পিতার নামে মানিকগঞ্জে দেবেন্দ্র কলেজ স্থাপন করেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ২৫০ টিরও বেশি লঙ্গরখানা পরিচালনা করেছিলেন বাংলার এই মহান দানবীর। যা হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের সময় সেই ভূমিকার কারণেই তাঁর শান্তিতে নোবেল পাওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি আমি। কিন্তু নোবেল ম্যানের কি আর নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন হয়? বাংলার মানুষের জন্য সারাজীবন নিজের অর্জিত সম্পদ যেভাবে ব্যয় করে গেছেন তাতে কোনো প্রাইজই তাঁকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট নয়।

১৯৪৭ সালে মায়ের নামে কুমুদীনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্টের অর্থ দিয়ে পরবর্তীতে সারাদেশে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালনা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে কুমুদীনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও স্বীকার করেছেন মুসলিম লীগকে আর্থিকভাবে কতটা সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন রণদাপ্রসাদ সাহা। একজন উঁচু মাপের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন তিনি। সর্বকালের সেরা বাঙালির তালিকা সেরা ২০-এ ঠাঁই না পাওয়াটাও আমার কাছে বিস্ময়ের মনে হয়। ১৯৭১ সালে এই মহান মানুষটিকে রাজাকাররা তাঁর ছেলেসহ ধরে নিয়ে যান। আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সোহরাওয়ার্দি, ভাসানী, বঙ্গবন্ধু, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকসহ প্রতিটি মানুষই রণদাপ্রসাদ সাহা সম্পর্কে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আমি গর্বিত, আমি ধন্য আপনার এলাকার একজন সন্তান হয়ে।

লেখক: কবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন