ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ মাঘ ১৪২৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

দিবস আসেনি, তাই অযত্ন অবহেলা!

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৪ ২:১০:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৪ ২:৫৪:০৪ পিএম

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষ লগ্নে ঘাতক পাকিস্তানি সেনারা নতুন করে ঘৃণ্য আয়োজনে মেতে ওঠে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা স্বাধীন এই দেশটি যেন আর কখনও মাথা তুলে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে না-পারে, এ কারণে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। দেশব্যাপী চলে এই হত্যাযজ্ঞ।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লাশের স্তূপের সন্ধান পাওয়া যায় রাজধানীর রায়েরবাজার ও মিরপুরে। পরবর্তী সময়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে এখানে গড়ে ওঠে স্মৃতিসৌধ ও কবরস্থান। বছরের ডিসেম্বর মাস ছাড়া অন্য ১১ মাস এই আবেগঘন,  স্মৃতিময় সমাধি পড়ে থাকে অযত্ন, অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায়। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বছরের এই একটি সময়েই এর সংস্কার করা হয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বিজয়ের শেষ মুহূর্তে আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, কবি, সাংবাদিক ও লেখকদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়। ওই তারিখ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের দুইশজন বুদ্ধিজীবীকে একত্রিত করা হয়। পরে তাদের মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন সেলে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের রায়েরবাজার এবং মিরপুরে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম সন্ধান পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমির। দেশের বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা ঘটলেও রাজধানীর মিরপুর এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মাণ করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকার স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। স্মৃতিসৌধের উচ্চতা ৫৮ ফুট বা ১৮ মিটার। সৌধটির নকশা করেন স্থপতি ফরিদ ইউ আহমেদ ও জামি আল শাফি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বধ্যভূমির চারদিকে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। মূল বেদির কাছে জলাধারে ভাসছে অসংখ্য কাগজ, প্লাস্টিক, বোতল। জলাধারটির পানিও ময়লা- ঘন সবুজ। চোখে পড়ল না কোনো নিরাপত্তা প্রহরী। যদিও তাদের সবসময়ই সেখানে থাকার কথা। আশেপাশের অবস্থা দেখে অনুমান করা যায়, রাতের বেলা বধ্যভূমিতে খোলা চত্বরে বসে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আড্ডা। দিনের আলোয় সেটি হয়ে ওঠে স্থানীয় বেকার যুবক, টোকাইদের আড্ডার নিশ্চিত জায়গা। ক্রিকেট, ফুটবল খেলা চলে দিনব্যাপী। খেলোয়াড়দের অধিকাংশই থাকেন বউ বাজার বস্তিতে। নিরাপত্তা প্রহরীরা ঠিকঠাক দেখভাল করেন না বলেই সাধারণ মানুষ স্মৃতিসৌধে যেতে দ্বিধায় ভোগেন। অনেকে নিরাপত্তার অভাব অনুভব করেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা বছর স্থাপনা পরিষ্কারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। বখাটে, মাদকসেবীদের আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হয় পবিত্র এই স্থান। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সৌধের সংস্কার করা হলে এখানে দর্শনার্থী বাড়বে বলে মনে করেন তারা। সীমানা প্রাচীর ছোট হওয়ায় দুর্বৃত্তরা যেকোনো দিক দিয়েই ঢুকতে পারে। বেদির সামনের খোলা জায়গায় গাড়ি চালানো শেখানো হয়। রাস্তার অপর পাশেই চোখে পড়ল কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা: ‘ড্রাইভিং শেখানো হয়’। রাজধানীতে এমন ফাঁকা জায়গা সত্যি দুর্লভ! কিছু মানুষ তারই সদ্ব্যবহার করছেন বিবেক বিসর্জন দিয়ে! দুর্বৃত্তরাও বসে নেই। গ্রিল ভেঙে চুরি করে নিয়ে যায় মূল্যবান সামগ্রী। স্থানীয় বখাটেদের দাপটে যেন অসহায় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ৮ আনসার সদস্য।

 

 

বধ্যভূমির মূল প্রবেশদ্বার তিনটি। মূল গেইটের সামনেই ‘মিডলাইন’ পরিবহনের বাসস্ট্যান্ড। গেইট লাগোয়া খোলা জায়গায় এলোমেলো করে রাখা হয়েছে অনেকগুলো মিনিবাস। বধ্যভূমির দেয়ালে পিতলের প্লেটের গায়ে খচিত ‘রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ’ লেখাটি পলিশ করছেন একজন। পাশেই সিকিউরিটি গার্ডের কক্ষটিতে তালা ঝুলছে। তালাবদ্ধ কেন? জিজ্ঞাসা করতেই সোহরাব হোসেন নামের ওই রং-শ্রমিক জানালেন, সবাই ধোয়ামোছার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ২৫ নভেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানকার গার্ড ও মৌসুমভিত্তিক শ্রমিকরা ব্যস্ত থাকেন পরিচ্ছন্নতার কাজ নিয়ে। তবে পরিচর্যার এ কাজের মাঝেও অসংখ্য ছেলেমেয়েকে দেখা গেছে বধ্যভূমির বেদিতে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই স্কুলগামী শিক্ষার্থী। বধ্যভূমির আরেক অংশে তখনও স্থানীয় ছেলেরা ক্রিকেট খেলা নিয়ে ব্যস্ত।

বধ্যভূমির মূল বেদিতে ধোয়ামোছার কাজে ব্যস্ত ছিলেন আট নারী ও দুই পুরুষ শ্রমিক। তিন বছর টানা এই কাজ করছেন রায়েরবাজারের কুলসুম আক্তার। তিনি বলেন, ‘বছরের এ সময়টায় আমরা বধ্যভূমি পরিষ্কারের কাজ করি। অন্য সময় কেউ আমাদের ডাকে না।’ একসময় এখানে অনেক দর্শনার্থী আসতেন। এখন তেমন কেউ আসেন না। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মীয়-স্বজনসহ সকলেই আসেন শুধু ১৪ ডিসেম্বর। সেদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করতেও এখানে নানা আয়োজন চোখে পড়ে। উপস্থিত থাকেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গন্যমান্য ব্যক্তিরা।

হঠাৎ একজন আনসার সদস্যকে দেখা গেল। বললেন, ‘এখানে প্রতিনিয়ত মাদকসেবীরা আসে। আজও একজন প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে এসেছিল। ধরে পুলিশে দেয়া হয়েছে।’ নাম কী জিজ্ঞেস করতেই তিনি কমান্ডারকে দেখিয়ে বললেন, ‘তার সঙ্গে কথা বলুন।’ জানা গেল কমান্ডারের নাম সিরাজ। পরিচয় দিয়ে মাদকসেবীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করতেই এড়িয়ে গেলেন। শুধু বললেন, ‘সৌধের সংস্কার কাজ নভেম্বর মাসে শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি গোয়েন্দারা এসে অবস্থান নিয়েছেন। শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে, নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয়ে যাবে। বাকি কাজগুলো দ্রুত এগোচ্ছে। সার্বক্ষণিকভাবে কাজের তদারকি করছে একটি দল।’

স্মৃতিসৌধটি নির্মাণের পর থেকেই রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেই। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় বধ্যভূমি অবহেলার শিকার হচ্ছে। এই স্থাপনা দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। করপোরেশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নিয়মিত এ স্থাপনা পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তিনি জানান, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সৌধের সংস্কার কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় সৌধের দুটি পুকুরের পাড়ে টাইলস বসানো, রাস্তা ও প্রাচীর সংস্কার, আলোক ও রং-সজ্জা করা হচ্ছে। সৌধের ভেতর ও বাইরের গাছের গোড়া সাদা ও কালো রং দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে।

চারদিকে শত কোলাহল, অপরিচ্ছন্ন আর অবহেলা অথচ নীরব শোক আর বেদনার বিমূর্ত প্রতীক এই রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। ইট-কংক্রিটে নির্মিত সৌধ হলেও এর গহীনে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের ত্যাগ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অবদানের শোকগাঁথা। পরিত্যক্ত ইটভাটায় স্থাপিত বধ্যভূমি থেকে আজও শোনা যায় শহীদের আর্তনাদ- যেন তাঁরা বলছে আমরা তোমাদের স্বাধীন স্বদেশ দিয়েছি, তোমরা কী আমাদের দিয়েছ যথাযোগ্য সম্মান?



ঢাকা/তারা