ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে বি‌সিএসে সফল তি‌নি

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:০৬, ৫ জুলাই ২০২০  
দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে বি‌সিএসে সফল তি‌নি

রাসেল ডিও

দিন শুরু হতো ভোর রাতে। পড়াশোনাই ছিলো একমাত্র কাজ। এরপর ক্লাস, শিক্ষকদের উপদেশ, সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ক্লাস শেষে বন্ধুরা যখন বান্ধবীকে নিয়ে রেস্তোরাঁ কিংবা ঘুরতে যেত, রাসেল ডিও তখন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ছুটতেন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে। সেখানেও চলতো নিবিড় পাঠ। সাধারণ জ্ঞান, আন্তর্জাতিক সমসাময়িক বিষয়ের মধ্যে ডুবে থাকা। সন্ধ্যা হতেই লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে যেতেন টিউশনির উদ্দেশ্যে। মিশে যেতেন মেগাসিটির লম্বা জ্যাম এবং কোলাহলে। মন পড়ে থাকত বইয়ের পাতায়। রাসেল এই কঠোর অধ্যাবসায়ের ফল পেয়েছেন, ৩৮তম বিসিএস-এ প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত গারো পরিবারের সন্তান রাসেল ডিও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে কর্মরত। তার এই সাফল্যের পথ মসৃণ ছিলো না। ধৈর্য ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বিগত দুই বিসিএস-এ ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকের উপহাস সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। রাসেল এই চেষ্টার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বলেন, ‘আমি আমার মানসিক যন্ত্রণা বুঝতে পারছিলাম। তাই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইটা করতে হয়েছে। আমি পরিবারকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আগে দিতে চেয়েছি।’

রাসেল ডিও’র মতো লাখ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করার পর বিপাকে পড়েন। অনেকে এ সময় টিউশনি করেন। কিন্তু সংসারের হাল ধরার জন্য এবার তো কিছু একটা করতে হবে। সংসারের হাল ধরতে হবে। কিন্তু বেকার যুবকদের স্বপ্নপূরণ স্থবির হয়ে পড়ে বিসিএসের দীর্ঘসূত্রতার জন্য। ২০১৭ সালে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ৩৮তম বিসিএসের ফল প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে। কাজে যোগদান করতে হয়তো ২০২১ সাল চলে আসবে। এই দীর্ঘ সময় তাদেরকে গভীর হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘ সময় রাসেল ডিওকেও বেকার থাকতে হয়েছে। এদিকে প্রথম দুটি বিসিএসে অকৃতকার্য হওয়ার ফলে তার মনোবলে কিছুটা চিড় ধরে। আবার পরিবার থেকেও আসতে থাকে মানসিক এবং আর্থিক চাপ। তাই এক সময় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঘুরতে থাকেন চক্রাকার এক বেকার বৃত্তে।

পরিবারের কথা চিন্তা করে তিনি আবার নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন। ঝাপিয়ে পড়েন বাংলাদেশের এক অদ্ভুদ বেকারত্ব ঘুচানোর যুদ্ধে। যে যুদ্ধে তার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪০ জন। আরো একটি তুমুল প্রতিযোগিতা শেষে উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৬২ জনকে মনোনীত করা হয় চূড়ান্ত সাক্ষাতকারের জন্য। সেই সাক্ষাতকার প্রক্রিয়া শেষে বেছে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২০৪ জন প্রার্থীকে। রাসেল ডিও সেই ২ হাজার ২০৪ জনের মধ্যে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। পেয়েছেন নিজের বহুল প্রত্যাশিত প্রশাসন ক্যাডার।

জীবনে সাফল্যের মাত্রা মাপা হয় বিভিন্ন নিক্তিতে। কেউ একটি চাকরি পেয়ে নিজেকে সফল মনে করেন। কেউবা নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধানে। কেউবা সাধারণ মানুষের সেবা করে নিজের সাফল্যকে পরিমাপ করেন। তবে দিন শেষে সবাই-ই সফল হতে চান। জীবিকা যেখানে সংকুচিত সেখানে অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। অধ্যাবসায়ের সেই গোপন সূত্রটি পরিপূর্ণভাবে কাজ করেছে রাসেল ডিওর একাডেমিক পরবর্তী জীবনে।

তিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের বঞ্চিত এবং সাধারণ মানুষদের নিয়ে। তাদের জীবনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জন করা জ্ঞান বাস্তব সম্মতভাবে সমাজে প্রয়োগ করাই এখন তার পরবর্তী জীবনের ব্রত।

 

ঢাকা/শান্ত

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়