RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৪ ১৪২৭ ||  ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

‘এলাকার মানুষের মরেও শান্তি নেই’

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০৫, ৩০ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ০৭:৩৮, ১ ডিসেম্বর ২০২০
‘এলাকার মানুষের মরেও শান্তি নেই’

সনাতনকাঠি গ্রাম জোয়ারের সময় এভাবেই ডুবে থাকে

শীতের কষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এলাকায় নতুন সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কারও ঘরে চালা নেই, কারো ঘরে নেই বেড়া। উত্তর থেকে আসা শীতল হাওয়া ভাঙা ঘরে ঢুকছে হু হু করে। চারদিকে জমে থাকা পানি শীতের প্রকোপ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু বিপন্ন মানুষের শীত নিবারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। আম্ফানের প্রলয়ে ঘরের সবকিছুর সঙ্গে শীতের কাপড়ও ভেসে গেছে। লেপ-কম্বল-কাঁথা অনেকের ঘরেই নেই। এমনকি অধিকাংশ মানুষের ঘরে নেই গায়ে জড়ানোর মোটা কাপড়। আম্ফানের পর ছয় মাস অতিবাহিত হলেও, পশ্চিম উপকূলের বহু মানুষ এখনও পানির সঙ্গে বাস করছেন। কাজ নেই, আয় রোজগারে পড়েছে ভাটা। এ অবস্থায় তিনবেলা খাবার যোগাড় করাই যেখানে কষ্টকর, সেখানে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে শীতের জন্য গরম কাপড় কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না।

‘ধার করা পুরনো একটি লেপ আর কিছু ছেঁড়া কাঁথা জোড়াতালি দিয়ে শীত নিবারণ করছি। নতুন করে শীতের কাপড় কেনার সাধ্য নাই।’ বলছিলেন আম্ফান বিধ্বস্ত সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাহুনিয়ার আহাদ আলী গাজীর স্ত্রী স্বপ্না খাতুন। তিন ছেলেমেয়েসহ পরিবারে লোকসংখ্যা ৫ জন। শীত নিবারণের কাপড় তাদের ছিল। কিন্তু এখন কিছুই নেই। বোন এবং মায়ের কাছ থেকে কিছু কাপড় নিয়ে এসেছেন। তাতে কিছুই হচ্ছে না। একই গ্রামের রেজওয়ান গাজীর স্ত্রী রেহানা বেগম বলছিলেন, ‘এখনও তো ঘরে পানি ওঠে। বেশি পানি উঠলে ঘরে থাকতে পারি না। অন্য ঘরে গিয়ে থাকি। শীতের কাপড় চোপড় সব ভেসে গেছে। নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্যও নাই। যা আছে পাতলা কাপড়, তা দিয়েই চালিয়ে নিতে হচ্ছে।’ একই কথা বলেছেন আনজুআরা বেগম, আহাদ গাজী, নূর ইসলাম, করিমন নেছাসহ আরও অনেকে। প্রতাপনগর ইউনিয়নের তালতলা বাজারের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুস সামাদ বলেন, ‘এবার এই এলাকায় শীত এসেছে একটু অন্যভাবে। এলাকার মানুষ এর আগে কখনো এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়নি। টানা ছয় মাস ধরে তারা বাড়িঘর নিয়ে বিপদে আছে। এ অবস্থায় এখন নতুন করে শীতের সংকট সামনে এসেছে। শীতকষ্ট নিবারণের জন্য এই এলাকায় ব্যাপকভাবে সহযোগিতা দরকার।’

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আশাশুনির প্রতাপনগর উপজেলার কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, সনাতনকাঠি, হরিশখালী, শ্যামনগরের বন্যতলাসহ বিভিন্ন এলাকা এখনও পানির নিচে। রাস্তাঘাট ডুবে আছে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে কিংবা বাড়ি থেকে সদর রাস্তায় উঠতে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে আসতে হয়। বহু মানুষ এখন মাচা পেতে ঘর বানিয়ে বাস করছেন। অনেকে আবার সব হারিয়ে এখনও আছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। এর মধ্যে শীত তৈরি করেছে নতুন সংকট। কথা বলছিলাম কুড়িকাহুনিয়া কাঠালতলী গ্রামের ছালমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ঘরই তো নাই। থাকি অন্যের ঘরে। শীতের কাপড় তো নাই-ই। খাবারই যোগাড় করতে পারি না, শীত নিবারণের কাপড় কিভাবে কিনি?’ একই কথা প্রায় সবার।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এলাকায় ইটের গাঁথুনির কবর

আম্ফান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে উঠে আসে অনেক সমস্যা। সাজানো-গোছানো ঘরবাড়ি যখন এলোমেলো হয়ে যায়, তখন সমস্যার শেষ থাকে না। ছয় মাস ধরে লবণ পানির সঙ্গে বসবাসের ফলে অনেকেই চর্ম রোগসহ পানিবাহিত নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। ঘরে ঘরে সর্দি-জ্বর লেগেই আছে। পেটের পীড়া, আমাশয়ের মতো রোগ নিত্যসঙ্গী। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ডাক্তারের কাছে যাওয়া কিংবা ওষুধপথ্য কেনার প্রয়োজন মনে করেন না অনেকেই। প্রতাপনগরে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

‘এই এলাকার মানুষের এখন মরেও শান্তি নেই।’ কথাটি কানে এলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে। কীভাবে মরেও শান্তি নেই? সেই প্রশ্নের জবাব একটু ভিন্ন। শ্রীপুর গ্রামে রাস্তার পাশে চোখে পড়ল একটি স্থান ইটের গাঁথুনি দিয়ে চারদিক ঘিরে রাখা হয়েছে। পাশে তিন ফুট, লম্বা পাঁচ ফুট। এখানেই সেই প্রশ্নের জবাব মিললো। এলাকাটি অনেকদিন ধরে পানিতে ডুবে থাকার কারণে মৃত ব্যক্তিদের দাফনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো মাটি খুঁড়ে মরদেহ দাফন করা সম্ভব নয়। ওই ইটের গাঁথুনি গ্রাম-ডাক্তার আইয়ূব আলীর মায়ের কবরস্থান। তার মা খুবই অসুস্থ। যে কোনো সময় মারা যেতে পারেন। তাই আগেই কবরস্থান বানিয়ে রাখা হয়েছে ইটের গাঁথুনি দিয়ে। মারা যাওয়ার সময় জোয়ারের পানি বেশি থাকলে কবর বানানো যাবে না। তাই এই ব্যবস্থা! 

ঘূর্ণিঝড়ের ছয় মাস পরেও আম্ফান বিপন্ন গ্রামের চেহারা

প্রতাপনগর পশ্চিম মাথা ফকির বাড়ি এলাকায় সম্প্রতি মারা গেছেন আনোয়ারা খাতুন নামে ৬৫ বছরের এক নারী। তার মরদেহ দাফনের জন্য বাড়িতে কোথাও শুকনো জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে তাকে খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে মান্দারবাড়িয়া চরে দাফন করা হয়েছে। মান্দারবাড়িয়া গ্রামে আরেক বয়সী ব্যক্তি মারা গিয়েছিলেন। তাকে দাফনের জন্য গলা সমান উঁচু করা হয়েছিল ইটের গাঁথুনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জোয়ারের পানির চাপে ইটগুলো ধ্বসে যায়। পরে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে পানির ভেতরেই। হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন প্রতাপনগর গ্রামের আবুল হোসেন। বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে কবর তৈরি করা হয়েছিল। লাশ দাফনের সময় হঠাৎ প্রবল পানির তোড়ে তার কবরের ইটের গাঁথুনিও ভেসে গেছে।        

এভাবেই হাজারো সংকটের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন আম্ফান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ। একদিকে করোনা মহামারির চাপ, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রলয়। বহুমুখী সংকটে এদের জীবন যেন থেমে গেছে। আবার কবে এই জনপদে প্রাণ ফিরবে কে জানে!

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়