ঢাকা     সোমবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ১০ ১৪২৮ ||  ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি’ মনে করে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি 

সাইফুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ৩ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৮:২০, ১৩ ডিসেম্বর ২০২১
‘মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি’ মনে করে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানাভাবে কাজ করছে বিভিন্ন সংগঠন। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা, স্কুল শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহ ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সিরাজগঞ্জে গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি ইতোমধ্যেই একটি ব্যতিক্রমধর্মী কাজ শুরু করেছে, যা সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে এলাকায়।

২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি। এর সংগঠকেরা সে সময়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে জনগণের ওপর নির্ভর করে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরই তারা গণহত্যার স্থান ও যুদ্ধস্থানগুলোতে জনগণকে সংগঠিত করে তাদের দ্বারা ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে মোমবাতি জ্বালিয়ে শহিদদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য সংগঠকেরা সিরাজগঞ্জ শহর ও শহরতলীর অন্তত পাঁচটি গণহত্যা স্থান ও যুদ্ধস্থান চিহ্নিত করে। স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরাজগঞ্জের বাহিরগোলা, শিয়ালকোল, চুনিয়াহাটি, তেতুলিয়া ও বাজার স্টেশন হরিজন কলোনি।

সংগঠকেরা স্থানগুলোর আশপাশ এলাকায় বসবাসরত শহিদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও জনগণের সঙ্গে বেশ কয়েকটি উঠোন বৈঠক করে। স্থানীয়রা আরো কিছু পরামর্শ দেন। পরামর্শের মধ্যে রয়েছে, শহিদদের নাম সংগ্রহ করে সে তালিকা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা, আলোচনা বৈঠক ইত্যাদি। এলাকাবাসী জানায়, এসব বৈঠকে আলোচক হিসেবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়। এলাকাবাসী সিদ্ধান্ত নেয়, শহিদদের নাম প্লাস্টিকের সাইনবোর্ডে লিখে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়ার। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও তারা সংগ্রহ করে।

সাইনবোর্ডে সকল শহিদের নামের আগে ‘শহিদ’ লেখা হয়। এতে ধর্মান্ধরা আপত্তি তোলেন যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শহিদ হয় না, তাই তাদের নামের আগে শহিদ লেখা ঠিক নয়। এ নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে এক পর্যায়ে ধর্মান্ধরা পিছু হটতে বাধ্য হন। মোমবাতি জ্বালানোতেও তাদের মৃদু আপত্তি থাকলেও তা আর ধোপে টেকেনি। এভাবেই বিজয়ী হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি।

এ ছাড়াও স্থানীয় উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবারের সফলতার পর সংগঠকেরা ধীরে ধীরে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কর্ম এলাকার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছেন। এ কাজের সুবিধা হচ্ছে এর উদ্যোগ নিতে কোনো নেতার প্রয়োজন পড়ে না, পরামর্শ নিতে হয় না, স্থানীয় উদ্যোগই যথেষ্ঠ।

অনুসন্ধান কমিটির অন্যতম সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী জানান, অনুসন্ধান কমিটি গঠনের পর জনগণের মধ্যে থেকে নানা কর্মসূচি সংগ্রহ করে পালন করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। তারা সেই কর্মসূচিকে সার্বজনীন করার চেষ্টা করছেন অনেকটা সমন্বয়কের মতো। যেমন, শিয়ালকোল এলাকায় মুক্তিযোদ্ধার ভাই শহিদুল ইসলাম মেম্বার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তার আশপাশের দুই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে ফুল দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। অনুসন্ধান কমিটির সংগঠকদের মধ্যে এমন কর্মসূচি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা হয়। সংগঠকেরা কর্মসূচিটি নিয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা করেন। স্কুল-কলেজ থেকেও এই উদ্যোগ সাদরে গ্রহণ করা হয়। যে কারণে ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রায় ৪০টি স্কুল-কলেজ সংগঠিত করা সম্ভব হয়। ওই সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের আশপাশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারকে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ফুল দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

সংগঠক জগলু চৌধুরী আরো জানান, এ সময় শিক্ষার্থীরা যখন বীর দর্পে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় তা নিয়ে যেমন জনগণের মধ্যে আলাদা কৌতূহলের সৃষ্টি হয়, তেমনি মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যরা হয়ে পড়েন আবেগাপ্লুত। এভাবেই সবার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ হচ্ছে এই অঞ্চলে।

মুক্তিযোদ্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাড. কেএম হোসেন আলী হাসান শিক্ষার্থীদের কাছে ফুল পেয়ে বলেন, এতে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবার যেমন সন্মানিত হন তেমনি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ আর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এমন কর্মসূচি বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।

অনুসন্ধান কমিটির সংগঠক রাজনীতিক নব কৃমার কর্মকার জানান, তারা দাবি তুলেছেন, বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তা বা স্থাপনা শহিদ বা মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণের। এজন্য তারা বিভিন্ন ইউপি অফিসে যাচ্ছেন। চেয়ারম্যান মেম্বাররাও তাদের দাবির সঙ্গে একাত্বতা প্রকাশ করে বিভিন্ন সড়ক বা স্থাপনা নামকরণের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিচ্ছেন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়াও তারা দাবি তুলেছেন ভূমিহীন গৃহহীন শহিদ পরিবারকে পুনর্বাসনের। দ্রুতই এসব দাবি কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

অনুসন্ধান কমিটির সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানু জানান, তারা লক্ষ্য করেছেন- গ্রামের মানুষ বৃক্ষরোপণে অভ্যস্ত, এমনকি এ নিয়ে তারা নানা আলোচনায় মেতে থাকতে পছন্দ করে। তারা মনে করেন যে, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির বটবৃক্ষ। তাই তারা গ্রামে গ্রামে বঙ্গবন্ধুর নামে বটবৃক্ষ এবং শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধার নামে কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নেন।  এসব বৃক্ষ পরিচর্যার জন্য কর্মী সৃষ্টি করে তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় দুইশ বৃক্ষ ইতোমধ্যেই রোপণ করা হয়েছে। তারা মনে করেন, এসব বৃক্ষ এক সময় হয়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, তেতুলিয়া গ্রামের মানুষ একটি কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষরোপণ করেন শহিদ শিবশঙ্কর নিয়োগীর নামে। এই শহিদ পরিবারের সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৮০ সালে, কেউবা ভারতে, কেউবা বাংলাদেশের বড় বড় শহরে। গ্রামের সঙ্গে ওই পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু যে কোনো মাধ্যমে ওই কৃষ্ণচূড়া রোপণের খবর পায় তার ছেলে ঢাকাস্থ বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক আশীষ শঙ্কর নিয়োগী। ৪০ বছর পর কিছুদিন আগে তিনি স্ত্রী সন্তান নিয়ে গ্রামে আসেন ওই কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ দেখতে। এভাবেই গ্রাম ফিরে পায় তার কোলের সন্তানকে, আশীষ শঙ্কর নিয়োগী পায় তার শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের।

লেখক মনিরুজ্জামান খান জানান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির কর্মকাণ্ড ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়