ঢাকা     শনিবার   ২০ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৭ ১৪৩১

বসন্তের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর

টোকন ঠাকুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৪, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১২:৩৮, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বসন্তের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর

ছবি এঁকে তুলি, জলরঙের ওয়াশে আঁকতে পারি। আঁকতে পারি প্রজাপতি। যদিও, প্রজাপতি, এই প্রায়পাখিটির ডানায় আঁকা ম্যুরাল দেখেই মুগ্ধ হয়ে পড়ি। মনে মনে বলি, প্রজাপতি, তোমার আত্মজীবনী আমি মুখস্থ করতে চাই। শুনেই, এই প্রায়পাখিটি উড়ে যায়। হঠাৎ সামনে পড়ে পোড়ো রাজবাড়ি। রাজবাড়িটা ভাঙা ভাঙা এবং ভৌতিক। ভীতিলুব্ধ সিঁড়ির ফোকর দিয়ে উড়ে যায় প্রজাপতি। আমি প্রজাপতিকে লক্ষ করে ওপরে উঠতে থাকি। প্রত্নকোঠার ছাদের কিনারে গিয়ে বলি, প্রজাপতি, তুমি উড়ে গেলেও তোমার ছবি আমি ঠিকই এঁকে রেখেছি। ফুলদের আমি এঁকেছি। কিন্তু ফুলের ঘ্রাণ আঁকব কী করে? ফুলের ঘ্রাণ কি আঁকা যায়? চুলের ঘ্রাণ?

ফাঁকা ফাঁকা দিন চলে যায়। ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ছুটে আসে হাওয়া। এই হাওয়া খুব প্ররোচনাকারী। এই হাওয়া বড্ড নেশাসূত্র ছড়িয়ে রেখে যায়। তারপরও, এই হাওয়াকে কেন যে সহ্য করি! হাওয়া, তোমার নামে নেশা মিশিয়ে রাখে। তুমি তাই নেশাই হয়ে ওঠো, এ রকম দিনে। দিনগুলো ফাঁকা ফাঁকা। দিনগুলো খুব লোনলি লোনলি লাগে।গানগুলো তোমাকে ডাকতে সাহায্য করে। আমি গানের ভেতর দিয়ে তোমাকে ধরতে যাই। আমি জানি, পাতা ঝরা বনভূমিজুড়ে শূন্যতা সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে।

বনভূমির সব গাছই একা একা। আমার মতো। দু-একটা গাছ থেকে থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাচ্ছে। দু-একটা গাছ কেবল শ্রোতা। দু-একটা গাছ খুব উসখুস করছে। যেন প্রিয় কেউ আসবার কথা। আমি কাকে প্রশ্ন করব, কোন গাছকে শুধাব, ও গাছ ভাই, বল তো চণ্ডালিকা এখন কোথায়? এমন ফাগুনকালে সে কোথায়, সে কোথায়, সে কোথায়? সে কি জানছে না, আমি গাছের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছি? তার কি একটুও টের পাওয়া হয় না, আমি একা বসে আছি অপেক্ষা শব্দটার পায়ের কাছে? তার কি মনে হওয়া উচিত নয়, এবার ফিরতে হবে। সে কি ভুলে গেছে ফেরার পিপাসা?

তরুলতা, তুমি শুনে রাখো, এ আমার ভালো লাগছে না। আমি বহুদিন, বহুপথ অতিক্রম করে করে আজ এই বনভূমিতে পৌঁছেছি। কিন্তু কোনো পাতা ঝরা সঙ্গীত শুনতে আসিনি। আমি বহু বাঁক পেরিয়ে আজ এই ফাগুনফোটা জঙ্গলে এসেছি। আমি গ্রীষ্মদিনের রোদে পুড়ে পুড়ে, তপ্ত হাওয়ায় ঘামতে ঘামতে এসেছি। আমি বর্ষাদুপুর মাথায় করে হেঁটে হেঁটে এসেছি। পথে দেখেছি, একটা শালিক কত একা। পথে কত নদী পার হতে হলো। সাঁতরে সাঁতরে কতদূর ভেসে চললাম। নদীপাড়ের কাশবন আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আমি শারদবেলার টানে দাঁড়িয়ে পড়িনি। আমি শিউলিফুলের ঘ্রাণ পেয়েছি বটে, কিন্তু সে ঘ্রাণে আটকে পড়িনি। আমি হেমন্তদিনের সন্ন্যাস নিতে নিতেও ব্রত ভেঙে বেরিয়ে পড়েছি। কেবল শীতে এসে একটু থামতে হলো, শীত কিছুটা ক্ষমতা রাখে বটে, তবে মূল ক্ষমতা শীতের কুয়াশার। ক্ষমতা রাখে শর্ষেফুলের মাঠ, শুকনো খালের সাঁকো, সন্ধ্যারাতের শিশির।

আমি জানতাম, শীত গেলেই আসবে ফাগুন, আসবে বসন্ত। তাই বিহ্বলতা ছিল, বিহ্বলতা আছে। আমি ফাগুনদিনের চিত্রনাট্য লিখতে চেয়েও পারিনি। ভেবেছি, তুমি এলেই তোমার সঙ্গে যা যা কথা হবে, যা যা কথাহীন মুহূর্ত সব লিখে দেব চিত্রনাট্যে। চিত্রনাট্যে থাকবে তোমার একছত্র উপস্থিতি। পার্শ্বচরিত্রে চলে যাবে কোকিল, ফুল, ফুলের ঘ্রাণ, পাতাঝরা গাছ, মন হু হু করা হাওয়া, শরীর খাঁ খাঁ করা গান কিংবা তুমি আর আমি মুখোমুখি বসে থাকব বনের মধ্যে, আবহসঙ্গীতে থাকবে শেষ পর্যন্ত রবি ঠাকুরের গান। আমরা হয়তো কথা বলব না, তবু গান বাজবে। আমরা হয়তো অনেকক্ষণ ধরে শুধু তাকিয়েই থাকব পরস্পর, যেন আমাদের কী বলার আছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক মনে পড়ছে না, আমরা হয়তো ফাল্গুনের  হাওয়ায় আমাদের সব কথা ছড়িয়ে দেব নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস থেকে তুলে আনব সমস্ত ফাল্গুনের ইতিহাস, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি লিপিবদ্ধ করে দেব আমার একা থাকা এক নাবিক জীবনের ইতিবৃত্ত। কিন্তু তুমি কোথায়? এ রকম আশ্চর্য ফাল্গুনের দিনে তুমি এত দূরে আছ কেন? কোথায় আছ? তুমি কি জানবে না, ফাল্গুনের জ্বলন্ত ঘটনাবলি? কেন আমি পুড়ে পুড়ে যাই পুষ্পমতি হাওয়ায়, কেন আমাকে বনভূমি বলে, আমি বসন্তের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর? 

ফাগুন আসে, বসন্ত আসে। ফুল ফোটে, পাখি গায়, বনে বনে উচ্চারিত হয়, কী যেন নেই, কী যেন নেই। কী নেই? বুকের মধ্যে খরখর করে ওঠে দগ্ধ শ্বাস, পোড়া পোড়া হাওয়া। আমরাও পড়ে যাই হাওয়ার খপ্পরে। ভালোবাসা এসে ডাক দেয়, প্রাণ বলে, পূর্ণ হ পূর্ণ হ। আমাদের কি সে সাধ্য আছে, আমরা বসন্তকে উপেক্ষা করব? অবহেলা করব? বকুতলায় উৎসব হয়, বসন্ত খুব সেজেগুজে আসে। মন্দিরে বাজে মন্দিরা। সুহাসিনী কোথায়? কত কঠিন কঠিন প্রহর আমি অপেক্ষায় থাকব? কখন দেখা দেবে চোখের সামনে কুরঙ্গ-বালিকা? আমি তোমাকে ফুলসমগ্র, ঝিরিঝিরি হাওয়াসমগ্র, ফাগুনের অর্ঘ্যসমগ্র দান করে সম্পূর্ণ হতে চাই। বুঝেছ?
 

তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়