ঢাকা     বুধবার   ২৯ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪৩১

আমার আম্মা পৃথিবীর সেরা

নাজমুল হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৯, ১২ মে ২০২৪   আপডেট: ১৯:১৭, ১২ মে ২০২৪
আমার আম্মা পৃথিবীর সেরা

তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। উপবৃত্তির টাকা আনতে আম্মা স্কুলে গেলেন। আসার সময় গণিত স্যার নালিশ দিলেন ‘আপা নাজমুল তো অংকে নম্বর কম পেয়েছে’। আম্মার চোখেমুখে তখন লজ্জা আর রাগের মিশেলে এক অবয়ব দেখতে পেলাম আমি। খুব ভয়ে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আম্মা স্যারকে বললেন, ‘আমি এবার শুনেছি আর হবে না’। স্কুল আর বাড়ি পাশাপাশি। আমি ঘরে এলাম, আম্মার ঘোষণা ‘খাওয়া বন্ধ’। সেদিনের শাসনের পর পড়াকেন্দ্রিক আম্মাকে কোনদিন কথা শুনতে হয়নি। মাথায় গেঁথে গেয়েছিল, আমার জন্য পড়ার নালিশ শোনা মানে আম্মার মান-সম্মানের বিষয়।

‘বাবা দিবসে’ ২০২২ সালে আব্বাকে নিয়ে লিখেছিলাম। লেখা মানে অব্যক্ত কিছু প্রকাশ। যেটা কখনও বলা যায়নি, বলা হয়নি। আব্বার সঙ্গে আমার ডিসটেন্স থাকলেও আম্মা খুব কাছের। সবার ছোট হওয়াতে আম্মার কাছে সব সময় থাকার অধিকার যেন আমার ‘দলিল করা’।

আব্বা নেপথ্যে থেকে কাজ করলেও আমাদের আট ভাই-বোনের পরিবারে আম্মা ‘প্রধানমন্ত্রী’। আব্বা সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার কারণে খুব কম সময় কাছে পেতাম। আম্মাই মূলত আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন সর্বোচ্চ সময়। প্রাইমারির গণ্ডি না পেরোনো আমার আম্মা দেখিয়ে ছিলেন, কম খেয়ে-পরেও কীভাবে ভালো থাকা যায়, শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তি থাকলে কীভাবে একটা পরিবারের প্রত্যেকে একাডেমিক পড়াশোনায় সর্বোচ্চ ধাপ অতিক্রম করতে পারে।

আমার বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্টের দিনের কথা খুব মনে পড়ে। পুবের ঘরে (পূর্ব ভিটের ঘর) বিছানায় আমি বসা, আর আম্মা মেঝেতে বসে ডাটা শাক কাটছেন। সেজো ভাই (আমরা ছোট্টভাই বলেই ডাকি) ঘরে এসে হুংকার দিলেন, যদি বৃত্তি না পাস ‘খবর আছে’। আমি তো ভয়ে একেবারে চুপসে গেলাম। মূলত আম্মার পর সেজো ভাই ছোটদের ব্যাপক শাসন করতেন। উনাকে আমরা এতই ভয় পেতাম, এখনও সামনে কথা বলতে গেলে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। আম্মা বললেন, ‘রেজাল্ট তো হোক। নাজমুল বৃত্তি পাবে’। কী কনফিডেন্স! অথচ আমার পেটে গুড়ুম-গুড়ুম চলছে। খানিক বাদেই নুরু কাকা বাড়ি এলেন। তিনি মলাইশ গ্রামের একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। নুরু কাকা আর জসিম মামা (আম্মার চাচাতো ভাই, উনিও আমাদের পাশের গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন) আমাকে গাইড করতেন। দুজনই পৃথিবীতে নেই। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দান করুক। নুরু কাকা জানালেন, আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি। আম্মা শুনে শুধু বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। ঘরে কোনও হৈ-হুল্লোড়ই নেই। কারণ, এটা তারা স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা করেছেন। বৃত্তি না পাওয়ার কোনও কারণই নেই। আর আমি বেঁচে গেলাম সেজো ভাইয়ের কঠিন মার থেকে। 

আম্মা আমাদের ভাই-বোনের পড়াশোনায় যথেষ্ট প্রভাব রেখেছেন। উনার আইডিয়া আর দূরদর্শিতা ছিল কল্পনাতীত। তিনি তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। আব্বাকে যখন অনেকে পরামর্শ দিতেন, ‘এত ছেলে-মেয়ে তুমি একা চাকরি করো, চাপ হয়ে চাচ্ছে। ওদের কাম-কাজে দিয়ে দাও, পরিবারে চাপ কমে যাবে’। আম্মা তখন ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। যত কষ্টই হোক, কাউকে বুঝতে দিতেন না। একটানা একের পর এক সবাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবার হওয়া স্বত্বেও দাদির আমলে আমাদের টানাপড়েন ছিল। কারণ, আব্বা একা উপার্জন করেন। আর আমরা বৃহৎ পরিবার। আম্মা কখনও আত্মবিশ্বাস হারাননি। আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন। 

আম্মাকে নিয়ে আসলে লিখে শেষ করা যাবে না। তাই প্রাইমারি জীবনের ছোট্ট দুটি স্মৃতি শেয়ার করলাম। এখনকার মা, আমাদের সময়ের মা-দের অ্যাটিটিউড আকাশ-পাতাল তফাৎ। যদিও এটা সময়ের চাহিদা। আমি মনে করি, তখনকার আদর-শাসন আমাদের পরিপূর্ণ করেছে। তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা কীভাবে করতে হয়— এসব তো আম্মাই শিখিয়েছেন। বাবা যদি প্রত্যেকের সুপারহিরো হন, আম্মা প্রথম শিক্ষক। যেটাকে বলে ‘পারিবারিক শিক্ষা’। এই শিক্ষা-ই নির্ধারণ করে দেয়, প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য কোন মুখী হবে।

আমার আম্মা এখন ‘শিশু’। আমি এখনও উনার মাঝে সেই অবয়ব দেখতে পাই। জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা আম্মাকে অনুসরণ করি। উনার প্রজ্ঞা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও আমাদের মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে দেয়। একজন মা হিসেবে আম্মাকে সফল মনে করি। উনি যা চেয়েছেন, হয়তো পেয়েছেন। আল্লাহ কবুল করেছেন। 

যে আমি একরাত আম্মা ছাড়া থাকতে পারিনি, এখন মাসের পর মাস কাটে। প্রযুক্তির এই যুগে আম্মাকে হয়তো সহজে দেখতে পারি। তবে, আলতো হাতের স্পর্শ আমাকে খুউব করে টানে। আম্মা যখন উনার নাতিকে (আমার ছেলে) দেখতে ফোন করেন, তখনও প্রথম প্রশ্ন ‘নাজমুল কী করে’। আম্মা কিছুই ভুলেন না। এটাই মা, মা-দের বৈশিষ্ট্য। আমার রাগী আব্বাকে আম্মা কীভাবে সামলে রেখেছেন, সেটা তো নিজ চোখে দেখা। আব্বা-আম্মার যুগলবন্দী আমার চোখে আরাম দেয়, নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। আসলে সংসার এভাবেই করতে হয়। এজন্যই, অর্ধাঙ্গীনি হিসেবেও আম্মা সফল। 

কথায় আছে, ছেলেরা ঘরছাড়া হলে আর ফিরে না। ধ্রুব সত্য। গেলেও সেটা যেন মেহমান। আমার বেলাও এমনটাই হয়েছে। আগের মত আর আম্মাকে কাছে পাই না। আমি ছোটবেলা এজন্য ফিরে পেতে চাই, যেটা অসম্ভব। প্রত্যেকের মা তার কাছে সেরা। আর আমার কাছে মনে হয়, আমার আম্মা পৃথিবীর সেরা।

মা দিবসে আম্মার জন্য নিয়ে কিছুটা প্রকাশ। যদিও, দিবস হিসাব করে মা-কে মনে করতে চাই না। আম্মা আমার চোখের মনি। প্রতিদিন স্নেহ নিতে চাই। কথা হলেই পুরনো আলাপ জুড়ে দিই। আম্মা হাসেন আর বলেন ‘তোর এতকিছু মনে থাকে?’। এই হাসি দেখলে মনে হয়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী, কারণ আমার আম্মা-আব্বা এখনও জীবিত আছেন। 

সবার কাছে দোয়া প্রার্থী। প্রত্যেকের মায়ের মুখে লেগে থাকুক হাসি। মাকে অনেক ভালোবাসি। মা দিবসের শুভেচ্ছা...!

 

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক, রাইজিংবিডি ডটকম

/এনএইচ/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়