ঢাকা     শুক্রবার   ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৩ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

অস্ট্রেলিয়ার আকাশে ডানা মেলা রিশাদের স্বপ্নের গল্প

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:১৬, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
অস্ট্রেলিয়ার আকাশে ডানা মেলা রিশাদের স্বপ্নের গল্প

রিশাদ হোসেন।

বল হাতে লেগ স্পিন, গুগলি, ফ্লিপার কিংবা স্লাইডার—সবকিছুতেই রিশাদ হোসেন এখন দারুণ পটু। শৈশব ও কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখলেও কথার ভুবনে সেই পুরোনো জড়তা যেন এখনো কাটেনি। ২২ গজে তার বোলিং আক্রমণ চোখ জুড়ানো, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের জন্য সে এক নতুন হুমকি। কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেই যেন রিশাদ পা রাখে এক অচেনা জগতে!

আগের রাতে বল হাতে ৪ ওভারে ২১ রানে ৩ উইকেট নিয়েছেন। নিজের বোলিং কেমন হলো? উত্তরটা স্রেফ এক শব্দের, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’

আরো পড়ুন:

স্বীকৃত এই ম্যাচ খেলার আগে রিশাদ স্বপ্নের ওড়াল দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ প্রতিযোগিতায়। হোবার্ট হ্যারিকেন্সের জার্সিতে ১১ ম্যাচে ১৫ উইকেট পেয়েছেন। আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় যৌথভাবে সপ্তম। বিদেশি স্পিনারদের মধ্যে সবার শীর্ষে বাংলাদেশের লেগ স্পিনারের অবস্থান। 

বিগ ব্যাশে যাওয়া, পারফর্ম করা, মেন্টর রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে সময় কাটানো, কিংবদন্তি ব্রেট লির সান্নিধ্য, প্রতিপক্ষ শিবিরে স্টিভেন স্মিথের মতো খেলোয়াড়কে পাওয়া…৩৯ দিন স্বপ্নের সময় কাটিয়েছেন রিশাদ। সেই গল্প নিশ্চিতভাবেই আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। কিন্তু কথার ঝাঁপি খুলে গড়গড়িয়ে বলা—এই ভুবনটা এখনো রিশাদের জন্য কঠিন।

অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ প্রতিযোগিতায় ধূমকেতু একাদশকে জিতিয়ে দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন রিশাদ। ৮ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশের মিশন নিয়ে প্রশ্ন। কিন্তু উত্তরগুলো ছিল একেবারেই নিস্তেজ ও মনমরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সবশেষ পোস্ট ২৪ জানুয়ারির। এক পাশে রিকি পন্টিং ও আরেক পাশে স্টিভেন স্মিথকে নিয়ে তার অস্ট্রেলিয়া সফরের শেষ ছবি। পোস্ট করেছিলেন এমন ক্যাপশন দিয়ে, ‘‘মৌসুম শেষ হলো। যে সফরে ছিল স্মৃতিতে সমৃদ্ধ।’’ সেই পোস্ট নিয়েই তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কি কথা হলো, কেমন সাড়া পেলেন তাদের থেকে। উত্তরে রিশাদ যা বলেছেন, ‘‘আসলে ছবি আমি তুলতে চাইনি। আমি বোলিং করছিলাম, উনারা ডাকছিল যে, ‘এইদিক আসো।’ আমি কথা বলছিলাম এই আর কি। তো উনারা অনেক অনেক ফ্রেন্ডলি এবং অনেক কিছু ওদের কাছে শিখার আছে। চেষ্টা করছি, যতটুকু কথা বলার এবং শিখার জন্য।’’ এর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরের অভিজ্ঞতা ও অর্জন নিয়ে জানতে চাইলে বলেছেন, ‘‘আসলে এতকিছু, জিনিস…দুই মাসের জিনিস একদিনে বলা সম্ভব না।’’

রিশাদ ট্রফি পাননি কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে একজন বাংলাদেশি লেগ স্পিনার যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তা দেশের ক্রিকেটের জন্য বিরাট খবর। কিংবদন্তিরা তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। রিশাদের দল হোবার্টের হেড অব স্ট্র্যাটেজি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন পন্টিং। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রিশাদের বোলিং দেখে তাকে মনে ধরে যায় পন্টিংয়ের। তার কারণেই রিশাদ খেলতে পেরেছেন বিগ ব্যাশে। কেমন সময় কাটলো দুজনের? সেই উত্তর রিশাদ দিয়েছেন এভাবে, ‘‘আসলে প্রতিদিন দেখা হতো। যেহেতু এক টিমেই ছিলাম। দুইটা কথা হয়েছে এবং অনেকগুলা কথা শেয়ার হয়েছে। এতটুকুই।’’

তবে অল্প কদিনেই অস্ট্রেলিয়ানদের মনে ধরেছে রিশাদের, ‘‘আমার কাছে মনে হয় যে ওরা অনেক বিনয়ী। যত বড় ক্রিকেটার হোক না কেন, ওরা অনেক সাদা সরল মনের। যে কাউকে আরামে অ্যাডজাস্ট করে ফেলে। আমার কাছে এটা ভালো লাগছে যে বড় ছোট কোনো কিছু দেখে না। এটা ভালো লাগছে। আমিও চেষ্টা করবো যে এরকম থাকতে।’’

রিশাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে বাংলাদেশের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেরও। যিনি বাংলাদেশের লেগ স্পিনারদের নিয়ে বরাবরই বড় স্বপ্ন দেখতেন।তার সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে রিশাদ বলেছেন, ‘‘দেখা হয়েছে কথা হয়েছে। বলছিলাম আর কি…আরও কি কি করা যায় সামনের দিকে, এই সব। যেহেতু তিনি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। চেষ্টা করছিলাম যে উনার কাছে আর দুই-একটা টিপস বা কোন কিছু নেওয়ার জন্য। এতটুকুই।’’

অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি আকাশ-পাতাল পার্থক্য। রিশাদের মতে অস্ট্রেলিয়ার খেলার পরিবেশটাই আলাদা। যা তাদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বহুদূর। তার পরামর্শ, বাংলাদেশও যেন এই দিকটায় উন্নতি করে, ‘‘ওরা সব কিছুতেই আলাদা। ওগুলা চিন্তা করলে আমাদের তো এত কিছু হবে না। আমার মনে হয়, এটা (পরিবেশ) আমাদের আরেকটু উন্নতি করা সম্ভব। সবকিছুতেই ওরা ভিন্ন।’’ স্কিলের দিক থেকে রিশাদের চোখে তেমন পার্থক্য ধরা পড়েনি, ‘‘স্কিল তো সবার উনিশ-বিশ। শুধুমাত্র ভালো মানসিকতা এবং ভালো পরিবেশ। আমার মনে হয় এই দুইটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’’

দেশের মাটিতে লেগ স্পিনারদের কদর খু্ব একটা নেই। বছরখানেক আগেও রিশাদকে বসে থাকতে হতো ডাগ আউটে। সেই রিশাদ এখন দেশের বাইরে ফ্রাঞ্চাইজি লিগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রথমবার বিগ ব্যাশে গিয়ে হোবার্টের জার্সিতে যে পারফরম্যান্স করেছেন তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট রিশাদ, ‘‘আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট।’’

সাকিব আল হাসানের পর প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিগ ব্যাশে খেললেন রিশাদ। ২০১৪ সালে অ্যাডিলেইড স্ট্রাইকার্সের হয়ে দুটি ও ২০১৫ সালে মেলবোর্ন রেনেগেডসের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলেন সাকিব। প্রথমবার তিনি সুযোগ পান ইয়োহান বোথার বদলি হিসেবে আর পরের বার খেলেন আন্দ্রে রাসেলের বদলি হয়ে। ড্রাফট থেকে সরাসরি সুযোগ পাওয়া রিশাদই প্রথম। প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করেছেন। সামনে আরো সুযোগ আসবে। সেগুলো রিশাদ দেদীপ্যমান হবেন এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়।

ঢাকা/ইয়াসিন

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়