যেভাবে আমরা নির্বাচন পেলাম
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: চ্যাটজিপিটির সাহায্যে তৈরি
আজকের পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো নির্বাচন। জনগণ যে পদ্ধতিতে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তার পেছনে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের দীর্ঘ ইতিহাস—কখনো পাথরের টুকরায় মতামত জানানো, কখনো আবার রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকার আদায়ের সংগ্রাম। যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলার মধ্য দিয়ে আজকের নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে—চলুন জানা যাক।
গ্রিসের পাথর থেকে ভারত উপমহাদেশের গণসংঘ
নির্বাচনের প্রাচীনতম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখতে আমাদের ফিরে যেতে হয় খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, রাষ্ট্রনায়ক ক্লিসথেনিসের সংস্কারের মধ্য দিয়েই সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। সে সময় আজকের মতো গোপন ব্যালট ছিল না; নাগরিকেরা হাত তুলে কিংবা পাথরের টুকরা ব্যবহার করে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতেন।
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশেও গণতন্ত্রের চর্চার নজির পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ আর. সি. মজুমদারের Ancient India গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এখানে ‘গণসংঘ’ বা ‘গণরাজ্য’ নামে একধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, যেখানে শাসক নির্বাচনের প্রথা বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ নির্বাচনের শিকড় এই উপমহাদেশেও গভীরভাবে প্রোথিত।
ব্রিটিশ ভারত ও ১৯৩৭-এর বাঁকবদল
আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ছিল একটি বড় মাইলফলক। এই আইনের অধীনে ১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার লাভ করে।
১৯৪৬: পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘গণভোট’
উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল তার The Sole Spokesman গ্রন্থে এই নির্বাচনকে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে একটি ‘অপ্রত্যক্ষ গণভোট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ওই নির্বাচনে মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় আইনসভার সব মুসলিম আসন এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম আসনে জয়লাভ করে, যা ভারত বিভক্তিকে কার্যত অনিবার্য করে তোলে।
১৯৫৪-এর ‘ব্যালট বিপ্লব’
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৩টিতে জয়লাভ করে। গবেষক বদরুদ্দীন উমর তার গবেষণায় এই ঘটনাকে বাঙালির প্রথম ‘ব্যালট বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন—যা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যালটের শক্তিশালী জবাব।
সত্তরের গণরায় ও মুক্তিযুদ্ধ
বাঙালির নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
রিচার্ড সিসন ও লিও ই. রোজ তাদের War and Secession গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জনগণের এই স্পষ্ট রায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে।
ঢাকা/লিপি