ঢাকা     শুক্রবার   ২২ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪৩৩ || ৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে দ্রুত বিচার জরুরি: মিতি সানজানা

স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৪২, ২২ মে ২০২৬   আপডেট: ১৬:০২, ২২ মে ২০২৬
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে দ্রুত বিচার জরুরি: মিতি সানজানা

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো সংবেদনশীল অপরাধে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ—এমন মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা। তার মতে, বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা, ফরেনসিক জটিলতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তিতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক দুর্বলতা বড় বাধা
রাইজিংবিডিকে মিতি সানজানা বলেন, ‘‘ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো মামলাগুলোতে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা যায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে মামলার শক্তি অনেকটাই কমে পড়ে। তার ভাষায়, “ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে আসতে অনেক সময় কেস উইক হয়ে যায়।”

আরো পড়ুন:

বর্তমানে দেশে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কার্যকর ফরেনসিক ল্যাব মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিচারপ্রার্থীদের ঢাকায় এসে পরীক্ষা করাতে হয়। বিভাগীয় শহরগুলোতে ডিএনএ ল্যাব না থাকাকে তিনি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছেন।

মিতি সানজানা বলেন, ‘‘দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ টেস্টের ল্যাব স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।’’

নতুন অধ্যাদেশে আলাদা ট্রাইব্যুনাল ইতিবাচক উদ্যোগ
সম্প্রতি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টি ইতিবাচক উদ্যোগ বলে মনে করেন এই আইনজীবী। নতুন অধ্যাদেশে এমন ট্রাইব্যুনালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি জানান, আগে ধর্ষণ মামলায় ডিএনএ টেস্ট বাধ্যতামূলক ছিল। এখন সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেও তদন্ত ও বিচার চালানো সম্ভব হবে। এছাড়া তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার সময়ও কমিয়ে আনা হয়েছে।
তদন্তের সময় ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে এবং মামলা নিষ্পত্তির সময় ১৮০ দিনের বদলে ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে মিতি সানজানার মতে, আইনে পরিবর্তন এলেও বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডেথ রেফারেন্সে দীর্ঘসূত্রিতা বিচারকে দুর্বল করছে
মিতি সানজানা বলেন, ‘‘নিম্ন আদালতে রায় হলেও অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগে। কারণ, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের পর্যায়ে মামলাগুলো আটকে যায়।’’

তিনি মনে করেন, পাশবিক ও অমানবিক অপরাধের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান না হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হয় না।

মিতি সানজানার ভাষায়, “বিচারহীনতার যে চেইন তৈরি হচ্ছে, তার কারণেই অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”

কঠোর আইন প্রয়োগের উদাহরণ হতে পারে অ্যাসিড সন্ত্রাস
অ্যাসিড সন্ত্রাসের উদাহরণ টেনে মিতি সানজানা বলেন, ‘‘একসময় দেশে অ্যাসিড হামলা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে কঠোর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।’’

তার মতে, “স্ট্রিক্ট আইনের অ্যাপ্লিকেশনই এটা কমিয়েছে। এখনো একইভাবে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।”

জামিনে বের হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর অভিযোগ
মিতি সানজানার মতে, বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আসে। এরপর তারা ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি দেখায়। ফলে অনেক পরিবার মামলা চালিয়ে যেতে সাহস পায় না।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘‘কোনো পরিবারের একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলে, সেই পরিবারের অন্য সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্ক তৈরি হয়। এতে পরিবার অনেক সময় চুপ হয়ে যায়।’’

“ভালো রেপিস্ট” বলে কিছু নেই
জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন মিতি সানজানা। অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলছেন। তবে তিনি মনে করেন, সেটি কখনোই সমাধান হতে পারে না।

তার মতে, মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে কারণ রাষ্ট্রের বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকাও মানুষের হতাশা বাড়িয়েছে।

সবশেষে মিতি সানজানা বলেন, “আইনের চোখে ভালো রেপিস্ট আর খারাপ রেপিস্ট বলে কিছু হয় না। রেপিস্ট ইজ রেপিস্ট। তাদের বিচার দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।”

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়