স্থানীয় হাসপাতালে হামের চিকিৎসায় ক্ষোভ, অভিভাবকদের ভরসা ঢাকা
সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া || রাইজিংবিডি.কম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও সুস্থ না হওয়ায় হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ঢাকায় আসছেন অভিভাবকরা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সঠিক রোগ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ তাদের। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের চাপ।
শুক্রবার (৮ মে) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে উঠে এসেছে এমন চিত্র।
হাসপাতালের পুরাতন ভবনের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে লক্ষ্মীপুরের সাত বছরের শিশু ইয়ান ইসলাম। তার বাবা শফিকুল ইসলাম জানান, এক সপ্তাহ আগে শিশুটির জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হয়ে আরো খারাপ হতে থাকে। পরে ঢাকায় এনে জানা যায়, শিশুটি হামেও আক্রান্ত।
তিনি বলেন, “জেলার হাসপাতালে ঠিকমতো রোগ ধরতে পারেনি। সময় নষ্ট হয়েছে। এখন ঢাকায় এনে কিছুটা ভালো আছে। এত কষ্ট আর ভোগান্তি কেন হবে?”
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মাদারীপুরের শিশু আয়েশা। তার মা খাদিজা আক্তার বলেন, “শরীরে লালচে দানা ও জ্বর দেখা দিলে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা ঢাকায় পাঠান।”
তিনি বলেন, “জেলার হাসপাতালে ভরসা পাইনি। গরিব মানুষ, তবু মেয়েকে বাঁচাতে ঢাকায় আসতে হয়েছে।”
সন্তানকে চিকিৎসক দেখাতে হাসপাতালে লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন অভিভাবক
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বরিশালের বাবুগঞ্জের শারমিন আক্তার। তার ছেলে আবদুল্লাহ কয়েক দিন আগে হাম আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ১১ দিন চিকিৎসার পর বাসায় নেওয়া হলেও আবার জ্বর ও কাঁপুনি শুরু হয়। পরে হাসপাতালে গেলে শয্যা খালি নেই জানিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।
শারমিন বলেন, “দুই দিন ধরে শুধু হাসপাতালেই ঘুরছি। কোথাও ঠিকমতো জায়গা নেই। ছোট বাচ্চাকে নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে অদ্যাবধি দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৩৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৫ হাজার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অনেক সময় দ্রুত হাম শনাক্ত করা যায় না। ফলে শিশুরা জটিল অবস্থায় ঢাকায় আসেন।”
তিনি বলেন, “অনেক রোগীর নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা পেলে এত জটিলতা হতো না।”
এই চিকিৎসক বলেন, “হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর হলেও এখনো অনেক এলাকায় টিকা কাভারেজে ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি টিকা নিয়ে নানা ভুল ধারণাও সমস্যা বাড়াচ্ছে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক বলেন, “হামের পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হলে সাধারণ মানুষকে ছোট রোগ নিয়েও ঢাকায় আসতে হতো না। কিন্তু জেলা-উপজেলায় দক্ষ জনবল, পরীক্ষা সুবিধা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।”
তিনি বলেন, “হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকাদানে ঘাটতি, নজরদারির দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কিন্তু এ টিকার কার্যকারিতা পেতে সময় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেনো আর কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, আগে থেকে সতর্ক থাকতে হবে।”
ঢাকা/মাসুদ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা