ঢাকা     শনিবার   ২৮ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৫ ১৪৩২ || ৯ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: রাজনৈতিক দলগুলোর টার্গেট মুসলিম ভোট

কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৩, ২৮ মার্চ ২০২৬  
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: রাজনৈতিক দলগুলোর টার্গেট মুসলিম ভোট

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ শতাংশ মুসলিম। একটা সময় এই মুসলিম ভোটকে ব্যবহার করেই ক্ষমতায় এসেছিল বামেরা। ২০১১ সালে রাজ্যটিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই মুসলিমরাই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ভোট ব্যাংক। এই নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি রাজ্যটির শাসক দলের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণ নীতির অভিযোগও তুলে থাকে। ফলে একদিকে তৃণমূল যেমন তাদের ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে সচেষ্ট, তেমনি বামেরাও নতুন করে মুসলিমদের মন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই আসন্ন নির্বাচনে ঈদ মঞ্চকে ব্যবহার করে সুকৌশলে জনসংযোগ সারলো তৃণমূল ও বামেরা। যদিও এক্ষেত্রে কয়েক যোজন দূরে ছিল বিজেপির প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে প্রার্থী তালিকায় তৃণমূলের সংখ্যালঘু মুখ ৪২ জন, আইএসএফ, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, সিপিআইএম সহ বাম দলগুলিও একাধিক মুসলিমকে প্রার্থী করেছে। তবে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় কোন মুসলিম নেই। অন্যদিকে কংগ্রেস তো এখনো প্রার্থী তালিকাই ঘোষণা দিতে পারেনি। 

প্রথম দফায় আগামী ২৩ এপ্রিল রাজ্যের ১৫২ টি আসনে ভোট নেওয়া হবে। ভোট শুরু হচ্ছে উত্তরবঙ্গ থেকে। দ্বিতীয় ও শেষ দফায় আগামী ২৯ এপ্রিল ১৪২ আসনে ভোট নেওয়া হবে। তার আগে প্রত্যেক দলের প্রার্থীরাই নিজেদের মতো করে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। 

গত শনিবার পবিত্র ঈদের দিন ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে সৌজন্য বিনিময় করেন ডান-বাম প্রার্থীরা। 

সকালটা শুরু হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা ব্যানার্জির হাত ধরে। নিজের ভাতিজা এবং দলের সংসদ সদস্য অভিষেক ব্যানার্জিকে সাথে নিয়ে রেড রোডে ঈদের জামাতে অংশ নেন মমতা। ঈদের মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়েই একদিকে যেমন কেন্দ্রের মোদি সরকারকে নিশানা করেছেন, ঠিক তেমনিই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে মমতাকে বলতে শোনা গেছে, “এসআইআর-এ আপনাদের অনেক নাম কাটা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আমার প্রত্যাশা আপনাদের সম্মান সুরক্ষিত থাকবে। আপনাদের সাথে যদি কেউ নাও থাকে, আমি সমস্ত জাতি পরিবারের সদস্য  হিসাবে আপনাদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার লড়াই চালিয়ে যাব।”

রেড রোডে ঈদের নামাজ শেষে পবিত্র ঈদ উপলক্ষে কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত কলিন লেন, রিপন স্ট্রিট এবং বেক বাগান এলাকাবাসীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী। এসময় তার সাথে ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জিও। সেখানে সবার ভালোবাসা ও আশীর্বাদ গ্রহণ করেন তিনি। ছোট ছোট শিশুরা মুখ্যমন্ত্রীর হাতে গোলাপ তুলে দেন। মুখ্যমন্ত্রী কেউ দেখা যায় ছোট শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে। অর্থাৎ এসব ঘটনাতেই দলনেত্রী বুঝিয়ে দিলেন সংখ্যালঘুদের কাছে তৃণমূলই একমাত্র ভরসা। 

এমনকি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে মমতা লিখেছিলেন, '“কলের ভালোবাসা ও আশীর্বাদে আমি আবেগাপ্লুত। সম্প্রীতির মেলবন্ধনে একত্রিত থাকুক এই বাংলা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একতাই- আমাদের পথ চলার মূলমন্ত্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই বাংলা সম্প্রীতির বার্তা বহন করে আসছে, আমার বিশ্বাস আগামী দিনেও দৃঢ় হবে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন। এই ভূমির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিই আমাদের সৌভ্রাতৃত্বকে অটুট রেখেছে। বাংলার এই সংস্কৃতি বিনষ্ট করতে উদ্যত বাংলা-বিরোধী দল। আমি আশাবাদী, এই বাংলায় কোনো স্বৈরাচারী শক্তি জয়লাভ করবে না। আপসহীন লড়াই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ এবং এগিয়ে চলার উপজীব্য। তাদের অপশক্তি, ক্রূরতা, হিংস্রতা, কুৎসা-অপপ্রচার এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ জবাব দেবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী দিনে অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়বে বাংলা।”

অন্যান্য জেলাগুলোতেওএকই ছবি! ফলে সেই সমাজের মানুষের মন পেতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেন নি প্রার্থীরা। 

উত্তর দমদম বিধানসভা কেন্দ্রে বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআইএম প্রার্থী দীপশীতা ধর খুশির ঈদের দিন ফতুল্লাপুরে সংখ্যালঘু মানুষের সাথে দেখা করেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তার অভিযোগ, এই অঞ্চলের প্রচুর মানুষ আছে যারা ৪০-৫০ বছর ধরে এইখানে বসবাস করছেন, অনেকে সামরিক দপ্তরেও কাজ করেছেন। এরকম মানুষদের বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করা হচ্ছে।

পাণ্ডুয়া বিধানসভার অন্তর্গত জিটি রোডে ঈদের নামাজে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সমীর চক্রবর্তী। মুসল্লিদের সাথে সৌজন্য বিনিময় করেন তিনি। মূলত ভোটের আগে জনসংযোগই ছিল মূল উদ্দেশ্য। ওই নামাজে দেখা যায় সাংসদ রচনা ব্যানার্জিকেও। ঈদের মঞ্চ থেকেই তৃণমূল প্রার্থীকে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী করে মমতা ব্যানার্জির হাতকে শক্ত করার আহ্বান জানান রচনা। 

ঈদের সকালে বাঁকুড়ার মাচানতলা জামা মসজিদে উপস্থিত থেকে জনসংযোগ সারেন সিপিআইএম প্রার্থী অভয় মুখার্জী। পরে সেখানেই আসেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অনুপ মণ্ডলও। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও দুই প্রার্থী নিজেদের মধ্যে কূশল বিনিময় করেন। সঙ্গে ছিলেন দুই দলের কর্মী, সমর্থকরা। 

পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল শহরের মুরগাসল ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন স্কুল প্রাঙ্গণে ঈদের জামাতে উপস্থিত ছিলেন আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ও রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটক। নামাজ শেষে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে দেখা করে তাদের ঈদের শুভেচ্ছা জানান এবং সৌহার্দ্যের বার্তা দেন। পরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মলয় ঘটক বলেন, “আমরা আশা করব, আগামী দিনেও উন্নয়নের ধারা বজায় থাকবে এবং মমতা ব্যানার্জি পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।”

হুগলি জেলার রিষড়ার ওয়েলিংটন জুট মিলে ঈদের নামাজে দেখা যায় শ্রীরামপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষ, সিপিআইএম প্রার্থী নবনীতা চক্রবর্তী। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জিও। প্রত্যেকেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। 

রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের ধর্মীয় উৎসবে একই মাঠে দেখা হল কামারহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্র, ওই কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী মানস মুখার্জি, পানিহাটি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ। উপস্থিত ছিলেন দমদম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ও। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি সকল প্রার্থীরাই অত্যন্ত কৌশলে ঈদের জামাতকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করলেন।  

বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে সকাল সকাল মসজিদে পৌঁছে যান ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী অজিত মাহাতো। ঈদের পবিত্র দিনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রচারেও জোর দেন তিনি। এদিন সকালে গোপীবল্লভপুর-২ নম্বর ব্লকের বড় আসনবনী ও জাহানপুর গ্রামের দুইটি মসজিদে যান অজিত মাহাতো। সেখানে উপস্থিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানান। 

তবে তৃণমূল এবং বামেদের দেখা গেলেও বিজেপি প্রার্থীদের সেভাবে ঈদের নামাজে উপস্থিত থেকে জনসংযোগ করতে দেখা যায়নি।

ঢাকা/সুচরিতা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়