ঢাকা     শনিবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৫ ১৪৩২ || ১০ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ঈদযাত্রা: ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি যেভাবে নেবেন

ডা. আশরাফ জুয়েল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪৯, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৪:৫২, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ঈদযাত্রা: ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি যেভাবে নেবেন

ছবি: সংগৃহীত

ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ, পরিবার-আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবকে কাছে পাওয়ার সুযোগ। শহুরে ব্যস্ততাকে ভুলে থাকা, দীর্ঘদিনের ক্লান্তি কাটানোর এক দারুণ সময়। আর মাঝের দুই দিন ম্যানেজ করে নিলে এবার ঈদুল ফিতরে তো লম্বা ছুটি—সতেরো মার্চ থেকে ছাব্বিশ মার্চ! এই সুযোগে অনেকেই আগেভাগেই গ্রামের পথে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা করে ফেলেছেন। বৃদ্ধ বাবা-মা, শিশু কিংবা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতিও সারছেন।

কিন্তু উৎসবের আনন্দের পথটা অনেক সময়ই কষ্টকর হয়ে ওঠে—বাস, ট্রেন, লঞ্চে অতিরিক্ত ভিড়; শিডিউল না মেলায় বাস-ট্রেনস্টেশন বা লঞ্চঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা; খাবার-পানির অনিয়ম; ঘুমের ঘাটতি—এসব তো থাকেই। যাত্রাপথে কী কী সমস্যা হতে পারে, আর হলে কী করবেন—এখনই ভাবার সময়। আসুন জেনে নিই, আর সেই অনুযায়ী নিয়ে ফেলি প্রস্তুতি।

আরো পড়ুন:

দীর্ঘ যাত্রায় সাধারণ ঝুঁকি কী কী?
ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, বমি, দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। বাসে বা লঞ্চে দুলুনি বেশি হলে মোশন সিকনেস বাড়ে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা দ্রুত হয়, আর শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

তাই যাত্রার আগে পর্যাপ্ত পানি, ওআরএস, হালকা খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা জরুরি। সুযোগ থাকলে যাত্রা শুরু করার আগে পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে নিন।

যাদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ আছে
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি বা হৃদরোগ—এসব দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে যাত্রায় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। নিয়মিত ওষুধ ঠিক সময়ে না খেলে হঠাৎ শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই কমপক্ষে ৫–৭ দিনের অতিরিক্ত ওষুধ সঙ্গে রাখুন।

ইনসুলিন ব্যবহার করলে ঠান্ডা রাখতে ছোট কুলার বা আইস প্যাক ব্যবহার করুন। খাবারের অনিয়মে ডায়াবেটিস রোগীর হাইপো বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া হতে পারে—হাতের কাছে চিনি বা গ্লুকোজ ট্যাবলেট রাখুন।

হাঁপানির রোগীরা ইনহেলার হাতের নাগালে রাখবেন, ভিড় ও ধুলাবালি এড়িয়ে চলবেন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন।

অন্তঃসত্ত্বা নারীর যাত্রা
গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে শুরুর তিন মাস এবং শেষ তিন মাসে। দীর্ঘ সময় একইভাবে বসে থাকার ফলে পা ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বা হঠাৎ ব্যথা শুরু হলে বিপদ হতে পারে।
তাই সম্ভব হলে একটানা বসে থাকা এড়িয়ে চলুন, মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে হাঁটুন। সিটবেল্ট থাকলে কোমরের নিচ দিয়ে লাগান। পানি পান করুন, ভারী খাবার নয়—হালকা খাবার খান। যাত্রার আগে নিকটস্থ হাসপাতালের যোগাযোগ নম্বর জেনে নিন। আর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হোন—যাত্রা আপনার জন্য নিরাপদ কি না।

হঠাৎ অসুস্থ হলে কী করবেন?
যাত্রাপথে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে বা অতিরিক্ত বমি করলে প্রথমে তাকে শুইয়ে দিন, মাথা এক পাশে কাত করে রাখুন যাতে শ্বাসনালীতে বমি ঢুকে না যায়। পানি বা ওআরএস ধীরে ধীরে দিন।

ডায়াবেটিস রোগী অজ্ঞান হলে মুখে কিছু দেওয়ার চেষ্টা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। শ্বাসকষ্ট বাড়লে ভিড় থেকে দূরে এনে বসান, ইনহেলার থাকলে ব্যবহার করান।

দুর্ঘটনার আশঙ্কা ও প্রাথমিক করণীয়
ঈদে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনার খবর প্রায়ই শোনা যায়। ছোটখাটো আঘাতে প্রথমে রক্তপাত বন্ধ করতে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চাপ দিন। হাড় ভাঙার সন্দেহ হলে নড়াচড়া করাবেন না—স্থির রেখে দ্রুত হাসপাতালে নিন।

গুরুতর দুর্ঘটনায় সময় নষ্ট না করে কাছের সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘কোন হাসপাতালে নেব?’—এই দ্বিধা অনেক সময় বিপদ বাড়ায়।

যাত্রার আগে করণীয়

যাত্রার দিন নয়, আগেই একটি ‘ট্রাভেল মেডিকেল কিট’ তৈরি করুন—নিয়মিত ওষুধ, জ্বর-ব্যথার ওষুধ, ওআরএস, গ্লুকোজ, স্যানিটাইজার, মাস্ক, ব্যান্ডেজ, ছোট থার্মোমিটার।

পরিবারের কারও বিশেষ রোগ থাকলে তার প্রেসক্রিপশনের কপি সঙ্গে রাখুন। শিশুদের জন্য আলাদা খাবার ও পানি রাখুন।

সচেতনতা মানেই নিরাপত্তা
ঈদযাত্রা কেবল আনন্দের নয়, দায়িত্বেরও। নিজের অসুস্থতা গোপন রেখে যাত্রা শুরু করলে বিপদ শুধু নিজের নয়, অন্যেরও হতে পারে। তাই অসুস্থ বোধ করলে যাত্রা পিছিয়ে দেওয়া সাহসী সিদ্ধান্ত।

মনে রাখতে হবে—ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সবাই সুস্থভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। উৎসবের ভিড়ের মধ্যেও একটু পরিকল্পনা, একটু সতর্কতা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। ঈদের পথে আনন্দ থাকুক, কিন্তু নিরাপত্তা যেন তার চেয়েও এগিয়ে থাকে।

লেখক: কনসালটেন্ট, এক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি কেয়ার সেন্টার, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ঢাকা/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়