বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি পোশাক খাতের
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
সুতা আমদানিতে বন্ড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্প চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। তাই অনতিবিলম্বে এ সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ’র প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেমসহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। বস্ত্রখাতকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক আরোপের পরিবর্তে সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্য যৌক্তিক করা, রপ্তানিমুখী স্পিনিং মিলগুলোর জন্য কর্পোরেট কর রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব।”
তিনি আরো বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে সরকার এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। অন্যথায়, শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।”
বিস্ময়কর বিষয় হলো—বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা আমরা পোশাক রপ্তানিকারকেরা হলেও, এত স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের মতামত সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, বলে জানান সেলিম রহমান।
তার মতে, এই পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘সেফগার্ড চুক্তি’র ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের শুল্ক আরোপের আগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে ‘গুরুতর ক্ষতি’ প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। এখানে তা করা হয়নি। ফলে এই সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ এবং শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয়কর।
তিনি জানান, আশির দশক থেকে তৈরি পোশাক শিল্পের ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি ছিল বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৯.৭২ শতাংশ। একই সময়ে সুতা আমদানিতে ওজনে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেরই প্রতিফলন। যেখানে কম দামে কাঁচামাল পাওয়া যায়, ক্রেতারা সেখানেই ঝুঁকবে—এটাই বাস্তবতা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে প্রতি কেজি সুতার আমদানি মূল্য ছিল ৪২৮.৩৭ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮৯.১৮ টাকায়। অথচ দেশীয় মিলগুলো একই সুতা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি দামে সরবরাহ করতে চাচ্ছে। এর ফলে নিট পোশাকখাতের প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত থাকার কারণ বাজার অর্থনীতিতেই নিহিত। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে ‘৩০ কার্ডেড’ এক কেজি সুতার দাম ২.৫০ থেকে ২.৬০ মার্কিন ডলার, সেখানে দেশীয় মিলগুলো একই সুতা ৩ ডলারে বিক্রি করতে চায়। বিশ্ববাজারে যেখানে এক-দুই সেন্টের ব্যবধানে অর্ডার হাতছাড়া হয়, সেখানে কেজিতে প্রায় ৪০ সেন্ট বেশি খরচ বহন করা বাস্তবসম্মত নয়, এমনটাই মনে করেন তিনি।
এছাড়া, তিনি বলেন, “স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বর্তমানে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে এবং লোকসানে রয়েছে। অথচ কৃত্রিম শুল্ক সুরক্ষার মাধ্যমে একচেটিয়া বাজার তৈরির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চমানের ও বিশেষায়িত সুতা—যেমন পিমা, সুপিমা কিংবা সুভিন—যা প্রিমিয়াম পোশাক উৎপাদনে প্রয়োজন, তা পর্যাপ্ত পরিমাণে ও সময়মতো সরবরাহে দেশীয় মিলগুলো সক্ষম নয়।”
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ মনে করে, এই মুহূর্তে স্পিনিং মিলগুলোর জন্য শুল্ক সুরক্ষা নয়, বরং প্রয়োজন আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করলে রপ্তানি আরও কমবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ইতিমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২.৬৩ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ডিসেম্বর মাসেই কমেছে ১৪.২৩ শতাংশ। এর ওপর কাঁচামালের দাম বাড়লে ক্রয়াদেশ আরো কমবে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক হবে, বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা/নাজমুল/জান্নাত