জুলাই সংস্কার পরিষদ: বিরোধীদের নোটিশে তুমুল বিতর্ক, সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা নিয়ে রবিবার নোটিশ উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধানসম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা নিয়ে বিরোধী দলের উত্থাপিত নোটিশের বিষয়ে ব্যাপক বিতর্ক হওয়ার পর মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদে এর ওপর আলোচনার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন স্পিকার।
এই আলোচনার জন্য সংসদে নোটিশ দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এই নোটিশের ওপর কখন আলোচনা হবে, তা নিয়ে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়েছে। তুমুল বিতর্কের মধ্যে অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল দেখা দেয়। পরে নোটিশটি সংসদে উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
নোটিশটি নিয়ে বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি ‘কাঁচা হাতের কাঁচা কাজ’ বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
রবিবার (২৯ মার্চ) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি অধিবেশনের বৈঠক ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে শুরু হয়। বৈঠকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিশটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং এটি নিয়ে আলোচনা করার দাবি জানান।
কিন্তু সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনা শেষ করতে হবে। এরপর অন্য কোনো নোটিশ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিশটি সংসদে উত্থাপন করে বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় এই সংসদ নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা।”
“১৫ মার্চ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উত্থাপন করলে স্পিকার পরামর্শ দিয়েছিলেন নোটিশ আনার জন্য। আমরা সেটা করেছি। নোটিশটি গ্রহণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়ে আলোচনার দাবি জানাচ্ছি।”
এর পরপরই ফ্লোর নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১ এর নোটিশের আলোচনা শেষে অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধদলীয় নেতা বলেন, প্রশ্নোত্তরের পরেই এ আলোচনা হবে। তিনি সে মোতাবেকই দাঁড়িয়েছেন।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলীয় নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনার বিধিটি আমরা দেখছি। ৭১ বিধির পরেই নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।”
তখন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “জনগণের রায়কে সম্মান দিতে হবে।”
এরপর ফ্লোর নিয়ে কথা বলতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তখন বিরোধীদলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন স্পিকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধি মোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির পর মুলতবি প্রস্তাব আলোচনা হতে পারে। তখন সরকারি দলও পয়েন্ট অব অর্ডারে কিছু কথা বলবে।”
তিনি স্পিকারকে বিধি মোতাবেক এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত, এর সুরাহা হওয়া উচিত।”
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “৬৪ বিধিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু সংসদের রীতি, যা চিফ হুইপ বলেছেন, সে জন্য বলেছি নোটিশটি আমরা পেয়েছি। ৭১ বিধির শেষে নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেব।”
চিফ হুইপ বলেন, “স্পিকার চাইলে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি স্থগিত রেখে যে কোন আলোচনা করতে পারেন।”
স্পিকার সংসদীয় বিধি অনুসরণ করে পরবর্তী কার্যদিবসে বা নির্ধারিত সময়ে বিষয়টি আলোচনার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ নিয়ে আলোচনা শেষে কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধিতে সংসদে নোটিশ উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। পরে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আলোচনায় সম্মতির কথা জানান।
তবে তিনি তার আগে বর্তমান সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫, মদিনা সনদসহ কিছু ডকুমেন্ট সংসদ সদস্যদের সরবরাহ করতে স্পিকারকে অনুরোধ করেন। এরপর এ বিষয়ে আগামীকাল ৩১ মার্চ জাতীয় সংসদে আলোচনা হবে বলে সিদ্ধান্ত জানান স্পিকারের আসনে থাকা ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল।
তিনি জানান, “ওই দিন, দিনের অন্যান্য কার্যসূচি শেষে এই বিষয়টির ওপর দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে।”
ডেপুটি স্পিকার সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুলতবি প্রস্তাবের বিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশটি আগাগোড়াই ভুল দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রস্তাবটি ৬২ বিধি অনুযায়ী হয়নি। এটাকে যেভাবে তোলা হয়েছে তা ৬৮ বিধিসংশ্লিষ্ট। ওই বিধিতে মাত্র আধা ঘণ্টা আলোচনার সুযোগ রয়েছে। ৬২ বিধিতে আলোচনা করতে হলে প্রস্তাবটি সংশোধন করতে হবে।”
এ সময় তিনি প্রস্তাবটি সংশোধন করবেন কি না, বিরোধী দলীয় নেতাকে প্রশ্ন রাখেন। এমনকি বিধি ৬৩ অনুযায়ী, যা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধান করতে হয়, তা যে মুলতবি প্রস্তাবের বিষয় হতে পারে না, এই সাধারণ সংসদীয় প্রথাটুকুও মাথায় রাখেনি বিরোধী দলের নীতি-নির্ধারকরা। এই অপরিপক্ব পদক্ষেপের কারণে জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিও এখন সংসদীয় জটিলতার জালে আটকা পড়ল।
বিরোধী দলের প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে বিরোধী দল।
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবটি দিতে গিয়ে ন্যূনতম ‘কার্যপ্রণালি বিধি’ অনুসরণ না করায় কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে কোন বিধিতে কতক্ষণ আলোচনা করা যায়, সেই সাধারণ জ্ঞানটুকুও বিরোধী দল দেখাতে না পারায় সংসদের ভেতরেই হাস্যাস্পদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংবিধান সংস্কারের মতো একটি বিশাল জনদাবিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্র আধা ঘণ্টার আলোচনায় সীমাবদ্ধ করতে চান বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি যুক্তি দেখান, বিধি ৬৮-এ গেলে মাত্র ৩০ মিনিট সময় পাওয়া যাবে, যেখানে বিধি ৬২-তে ২ ঘণ্টা সময় পাওয়ার সুযোগ থাকে।
মন্ত্রীর এমন অনমনীয় অবস্থানে সংসদে উপস্থিত বিরোধী সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সরাসরি অধিবেশনে আলোচনার পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি-বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, এই কমিটি দেশের বিশিষ্টজন ও সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট দেবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রস্তাবকে রীতিমতো নাকচ করে দিয়ে স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনিই হাউসের অভিভাবক, আপনিই ডিসাইড করবেন।”
ডেপুটি স্পিকার সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারো ফ্লোর চাইলে সাড়া না দিয়ে ডেপুটি স্পিকার জানান, তিনি তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন।
এরপরও সালাহউদ্দিন আহমদ বেশ কিছুক্ষণ সংসদে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে স্পিকার তাকে কোনো সময় না দিয়ে দিনের অন্য কার্যসূচিতে চলে যান।
ঢাকা/এএএম/রাসেল
ফেরি পারাপারে ঝুঁকি কমাতে এখন থেকে কোনো বাস সরাসরি যাত্রীসহ ফেরিতে উঠতে পারবে না: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী