ঢাকা     শনিবার   ২৮ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৫ ১৪৩২ || ৮ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সালেহা ফেরদৌসের ফ্যান্টাসি ফিকশন– কল্পনাপ্রতিভার ইঙ্গিতবাহী এক সৃষ্টি

কাজী রাফি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩২, ২৮ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৩:৩৩, ২৮ মার্চ ২০২৬
সালেহা ফেরদৌসের ফ্যান্টাসি ফিকশন– কল্পনাপ্রতিভার ইঙ্গিতবাহী এক সৃষ্টি

লেখালেখির জগতে তরুণ লেখকদের বেশ কিছু বই আমার হাতে এসেছে। তাদেরকেও পাঠ করা, মূল্যায়ন করা জরুরি বলে আমি মনে করি (যদিও সময় নিয়ে আমার জীবনে বিরাট এক যুদ্ধ আছে)। তারা আমাদের সাহিত্যকে কোথায় নিয়ে যাবে/যাচ্ছে –এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাও জরুরি। 

আজ লিখছি সালেহা ফেরদৌস –এর ফ্যান্টাসি ফিকশন ‘পেখম ফিরে আসার পর, বদলে গেল বিশ্ব চরাচর’ নিয়ে। হ্যাঁ, ফিকশনের নামটা বেশ বড়। এত বড় নামের কারণেই হয়তো আমি উপন্যাসটা পড়তাম না। কিন্তু সালেহা ফেরদৌসের পাঠ-সক্ষমতা সত্যিই ঈর্ষা-জাগানিয়া। তিনি প্রায় ১৬০ বই নিয়ে ফেসবুকে রিভিউ লিখেছেন। তার সাথে আমার পরিচয় খুব সম্ভবত পাঁচ মাস আগে। তিনি ‘ত্রিমোহিনী’ নিয়ে লিখেছিলেন এবং সেই লেখায় ফাল্গুনি তানিয়া আমাকে মেনশন করায় লেখাটা আমার দৃষ্টিগোচর হয়। উপন্যাস পাঠ এবং তার রিভিউ পড়ে আমার মনে হয়েছিল তিনি সমৃদ্ধ মননের শুধু নন, তার মাঝে প্রবল দেশপ্রেম, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টির প্রতি প্রবল মায়া য়াছে। সালেহা ফেরদৌস বিগত কয়েক মাসে আমার অর্ধেকের বেশি বই পড়ে ফেলেছেন এবং সবগুলো নিয়ে রিভিউ লিখেছেন –এটাও আমার জন্য বিস্ময়ের। একজন প্রবল পাঠক কী লেখালিখি করছেন –সেটা জানার ইচ্ছা থেকেই বইমেলা থেকে আমি তার উপন্যাসটি সংগ্রহ করি।

কল্পনা প্রতিভার সাথে একজন লেখকের কাছ থেকে আমি এই জিনিসটাই প্রত্যাশা করি। তরুণ লেখকদের কাছ থেকে তার পাঠাভ্যাসে মগ্ন এক জীবন বেশি সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করি। আমাদের সকলের জীবন যদিও অনেক ব্যস্ত। তবু, এই ব্যস্ততার অন্তরালে আমরা যে জীবনকে লালল করি, সেটাই তো আমাদের সত্যিকারের জীবন। একজন লেখকের ঠিক সেই জগতটা নিঃসন্দেহে আর দশজন মানুষের থেকে আলাদা, নন্দনতাত্ত্বিক অভিযানে, মানবিক পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়ে পরিপূর্ণ। 

আমি একজন লেখকের (বিশেষত গল্পকারের) মাঝে (মানে তার সৃষ্টিতে) কী কী খুঁজে ফিরি? প্রথমত তার কল্পনাপ্রতিভা; একটা অদৃশ্য জগতকে পাখির নরম পালকের মতো করে তুলে আনার সক্ষমতা। একটা জগতকে পাঠকের চিন্তার, কল্পনার জগতে আড়মোড়া ভেঙে মগ্ন রাখার সক্ষমতা, তার ভাষাশৈলীকে তিনি সত্যিই নিজস্ব করে তুলতে পেরেছেন কিনা -ইত্যাদি। 

গল্পের এমন একটা জগত সৃষ্টি যা বাস্তবে না থাকলেও যখন পাঠকের মনে হয়; সেই জগতটা কোথাও না কোথাও রয়েছে। আসলে তা রয়ে যায়, পাঠকের স্মৃতিলোকে। যে স্মৃতিলোককে পাঠক বাস্তব জীবন এবং জগত থেকে আলাদা করে আর ভাবতে পারেন না। এভাবেই পাঠকের জীবনাভিজ্ঞতার দিগন্ত প্রসারিত হয়, তার কল্পলোক এবং সূক্ষ্ম মানবিক অনুভবগুলো সমুন্নত হয়। যাহোক, সালেহা ফেরদৌসের ‘পেখম ফিরে আসার পর, বদলে গেল বিশ্ব চরাচর’ কল্প-উপন্যাসের কাছে যাচ্ছি। 

উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি উপন্যাসের নায়িকা পেখম বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে। বছর শেষে ফিরে সে আসলে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার লোকজন এ নিয়ে বড় ধরনের নিউজ কাভারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অদ্ভুতভাবে আমরা জানতে পারি, স্থলে নয় জলের নিচের এক সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে ছিল পেখম। অবিশ্বাস্য এই ঘটনার পর পেখমের পরিবার, সামাজিক পট বদলাতে থাকে। কিন্তু পেখমকে অনেক আগে থেকে ভালোবেসে ফেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপনায় মাত্র যোগদান করা প্রাণিবিদ অহম ততক্ষণে পেখমকে নিয়ে মেতেছে নতুন স্বপ্নে। বিয়ে, সংসার, সন্তান –এসব স্বপ্নই যখন অহমের চেতনায় খেলা করে ঠিক তখনই তার কাছে পেখমকে নিয়ে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর যড়যন্ত্র করছেন –তা টের পাওয়ার পর অহমের শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ। সেই অধ্যাপকের ইশারায় গবেষণার প্রয়োজনে পুনরায়, বলা যায়, হাইজ্যাক হয়ে যায় পেখম। 

বিজ্ঞানীদের একটি দল ধরে নিয়ে যায় তাকে। পেখমের অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে মরিয়া অহম এক সময় জানতে পারে রাঙামাটির কোনো এক নির্জন, গোপন স্থানে পেখমকে বন্দী রাখা হয়েছে। সেখানে পেখম যেভাবে পানির নিচে এক জগতে বেঁচে ছিল সেভাবেই অন্যদের টিকিয়ে রাখতে সেই বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের। যাদের কানের পেছনে ফুলকা সংযোজন এবং মানব ফুসফুসকে পানিতে অস্কিজেন গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা মেরে ফেলছে একের পর এক শিশুকে। 

রাঙামাটির সেই স্থানটি অহম তার পুলিশ অফিসার বন্ধুর মাধ্যমে লোকেট করতে সক্ষম হয় এবং শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতির মাধ্যমে সে পেখমকে সেখান থেকে উদ্ধার করে পালাতে সক্ষম হয়। পেখম সিদ্ধান্ত নেয় এই মানুষের পৃথিবীতে সে আর বাস করবে না। অহম নিয়ে যাবে তার নিজের বাস করা এক বছরের সেই পানির নিজের মানবিক এক জগতে যেখানে বাস করছে মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার প্রাচীন সভ্যতার আমাদের পূর্ব পুরুষগণ। 

পানির নিচের জগতটাতে অহমের শরীরে বেশ কিছু অপারেশন চালিয়ে তাকেও পানির নিচের জগতে টিকে থাকার উপযোগী করে তোলে। তাদের অভিনব পন্থায় বিয়ে হয়। এই বিয়েতে যে সংস্কৃতি বা প্রথা লেখক কল্পনায় জন্ম দিয়েছেন তা ছিল আমার বড় ভালো লাগার একটা কারণ। কল্পনা কত সজীব হলে অন্য একটা জগতই শুধু নয় সেই জগতের প্রথা, কৃষ্টি, আর সংস্কৃতি নিয়ে নিরেট কিছু বর্ণনা চলে আসে যা চোখের সামনে ভাসতে থাকে। বিয়ের পর পেখম আর অহমের সন্তান, প্রাচীন মহেঞ্জোদারো হরপ্পার মানুষদের সাথে তাদের মিথস্ত্রিয়া বা নির্বিঘ্ন মানবিক জীবন চলমান দেখি। কিন্তু নস্টালজিয়া তো মানব জন্মের সবচেয়ে বড় অর্জন। চাইলেই কি ফেলে আসা জগতকে ভুলে থাকা যায়? নিজের মা-বোন-বাবা তাদের জন্য অহমের মন উতলা হয়ে ওঠে। তাছাড়া পানির নিচে যে সভ্যতা তাও মূলত টিকে আছে স্থলে জন্মানো অনেক ফসল আর খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে। পৃথিবীর স্থলে বাস করা মানুষদের কাছ থেকে অত্যন্ত আধুনিক যানে করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে খাদ্য-পরিবহনের পথটা আর গোপন থাকে না। মূলত অহমের পৃথিবীর সাথে সংযোগের কারণেই সেই গোপনীয়তা ভেঙে যায়। পানির নিচের জগত থেকে সম্পদ আহরণে পৃথিবীর মানুষগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে । আর তাদের পক্ষে সেই পথটুকু শনাক্ত করা সম্ভব হয় কানাডায় বাস করা বোনের সাথে অহমের যোগাযোগের মাধ্যমে। 

শুরু হয় পৃথিবীর ভয়ংকর লোভী আর ক্ষমতাধর মানুষের সাথে মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার সভ্য মানুষের লড়াই। স্থলের মানব সভ্যতার নামে ‘অসভ্যদের’ সাথে ‘সভ্যতার’ সেই যুদ্ধই কি বয়ে আনতে যাচ্ছে মহাপ্রলয়? জলে-স্থলে? মানুষই কি এই মহাবিশ্বকে মানুষের জন্য বাসযোগ্যহীন করে তুলছে না? এই প্রশ্নটাইএই ফ্যান্টাসি-ফিকশনে বড় হয়ে দেখা দেয়। 

জলের পৃথিবীর বর্ণনার সাথে বিজ্ঞান, প্রেম ও মানবতা, পৃথিবীর অনিশ্চিত যাত্রা এই ফিকশনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। 

কল্পনা কত ভয়াবহ হলে এক অজানা জগতকে কেউ এমন করে জন্ম দেবার কথা ভাবেন? লেখকের কল্পনার উল্মফন সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। যারা বলেন, নারী লেখকরা শুধু ঘর-সংসার, জাগতিক সমস্যা, পরকীয়ার বাইরে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারছেন না, তাদের জন্য ছোট পরিসরের হলেও এই উপন্যাসটা একটা ধাক্কা দেবে বৈ কি! 

একটা দেশের সাহিত্য একটা সামগ্রিক যাত্রা। আমাদের দেশে পাঠক মূলত কমে গেছে একই প্যাটার্নের, চিন্তার রেখাহীন সরল-রৈখিক পারিবারিক আর সামাজিক বস্তাপচা প্যাচালের গল্পের কারণে। আমি মনে করি তরুণ লেখকদের এমন অভিনব কল্পনা লেখার জগতে আবার একটা ঢেউ জাগাবে। 

আমি যে বিষয়গুলোর দিকে ঔপন্যাসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি- 
১) ফ্যান্টাসি ফিকশনে ভিন্ন যে জগতকে আপনি নির্মাণ করেছেন তার সূক্ষ্ম ডিটেইলিং উপন্যাসটিকে আরো প্রাণবন্ত করবে। দ্বিতীয় সংস্করনে সেই দিকটা খেয়াল রাখবেন। এবং আমি বিশ্বাস করি, সেটা আপনার কল্পনা দিয়ে করা সম্ভব।

২) বিদেশি ফ্যান্টাসি ফিকশনের বর্ণনার ছায়া পড়েছে আপনার উপন্যাসে। এমন অভিনব কল্পনাটাকে একান্ত আপনার নিজস্ব করে তোলার জন্য ভাষাশৈলীর প্রতি আরো নজর দিন। ভাষাটা যেদিন আপনার নিজস্ব সিগনেচারযুক্ত হবে সেদিন লেখার জগতে আপনার এক অনন্য এবং অপ্রতিরোধ্য শক্তি তৈরি হবে।

৩) একটা উপন্যাসে শুধু ঘটনা সেই সৃষ্টি তাকে মহান করে না। আখ্যানের সাথে জীবনদর্শন, দৃশ্যকল্পের দিকে আরো মনোযোগ দিতে হবে। আমরা তো জীবনার্তিকে স্পষ্ট করতেই ঘটনা পরম্পরা তৈরি করি; তাই না?

৪) উপন্যাসে একজন ঔপন্যাসিকের ব্যক্তিত্বের ছাপ থাকে। সেই প্রভাবটা নায়ক-নায়িকার চরিত্রেও থাকে। অহমকে অতটা প্রেম-পাগল করে সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। হালকা ব্যক্তিত্বের নায়করা কিন্তু ঔপন্যাসিককেও সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে না। নেস্কট টাইম কিক দোস এলিমেন্টস আউট ফ্রম দ্য কারেক্টার অব হিরোস। 

লেখালিখির জগতে সালেহা ফেরদৌস নতুনই হবেন। তার কল্পনাপ্রতিভা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মনে হচ্ছে, আমাদের তরুণদের হাতে আমাদের আগামী দিনের সাহিত্য পথ হারাবে না। আপনার মতো তারুণ্যের প্রবল কল্পনা আমাকে তাই-ই বলছে। 

সালেহা ফেরদৌস, আপনাকে সাহিত্য, জীবন আর ভাষা নির্মাণের এই নির্মম ঠা ঠা রোদ্দুরময় যুদ্ধের মাঠে স্বাগতম। আপনাকে অভিবাদন। 

ঢাকা/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়