ঢাকা     বুধবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৫ ১৪২৮ ||  ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বাস শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় শিক্ষার্থীরা নেবে কেন?

রাজন ভট্টাচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪২, ২৬ নভেম্বর ২০২১  
বাস শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় শিক্ষার্থীরা নেবে কেন?

যে কারো মনে প্রশ্ন উঠতে পারে- বাসে হাফ ভাড়া নিয়ে চলমান ছাত্র আন্দোলন কি সমাধানযোগ্য নয়? অর্ধেক বাস ভাড়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও  পরিবহনসংশ্লিষ্টরা এখন মুখোমুখি অবস্থানে। বেশ কয়েকদিন ধরেই এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সড়ক অবরোধ করছে।

এতে প্রায় অচল হয়ে পড়ছে মেগাসিটি। দিনভর দুর্বিষহ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীদের। এমন অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অথচ এই সমস্যার সমাধান তেলের দাম বাড়ার পর বাস ভাড়া পুনরায় নির্ধারণে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের মধ্যেই রয়েছে। এরপরও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষই সমাধানে না গিয়ে উল্টো বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে সমস্যা যদি বাড়ে তবে দায় কে নেবে?

এটা সত্য যে, হাফ পাস আইনসিদ্ধ নয়। যুগের পর যুগ ধারাবাহিক চলে আসা বিষয়টি এখন প্রথায় রূপ নিয়েছে। সারা দেশেই শিক্ষার্থীরা কম-বেশি হাফ ভাড়া দিয়ে বাসে যাতায়াত করছে। ঢাকায় বাসে হাফ ভাড়া নিয়ে প্রথম বিপত্তি শুরু হয় কথিত সিটিং সার্ভিস ও ছোট পরিবহন ম্যাক্সি, লেগুনা ইত্যাদি চালুর পর। কাউন্টার-ভিত্তিক সার্ভিসগুলোর দিন শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে সমস্যা হয়। বিভিন্ন পয়েন্টে মালিকপক্ষ ‘চুরি’ ঠেকাতে চেকার রাখেন। কাজেই সিটের বিপরীতে ভাড়া কম উঠলে মালিকরা চাপ দেন শ্রমিকদের। তাছাড়া রাজধানীতে এখন বাস মালিকরা দিন চুক্তিতে শ্রমিকদের হাতে বাসের চাবি তুলে দেন। দিন শেষে তারা জমার টাকা বুঝে নেন। ফলে শ্রমিকদের জমার টাকা ওঠানোর তাড়া থাকে। সেক্ষেত্রে হাফ পাস তাদের জন্য সমস্যা বটে।

সমস্যা সমাধানে সরকার-বাস মালিক-শিক্ষার্থী সবাইকে ছাড় দিতে হবে। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়া কার্যকর করার দাবি তোলে। তখন ঢাকা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির ভেতরে অন্যতম ছিল- শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা বিভিন্ন সময় দিয়েছেন। কিন্তু বাস মালিক বা শ্রমিকরা সে কথা আমলে নেননি। বড় সংকট নিয়ে যখন বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে তখনও এ প্রসঙ্গে গড়িমসি চোখে পড়ছে। কেউ কারো বিরাগভাজন হতে চাইছেন না।

সর্বশেষ অনেক খাতে ব্যয় বেড়েছে, এই অজুহাতে ভাড়া বাড়িয়েছেন বাস-মালিকরা। তেলের দাম বেড়েছে ২৩ ভাগ, অথচ বাস ভাড়া বেড়েছে ২৭ ভাগ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার বিষয়টি একেবারেই ধামাচাপা পড়ে গেছে। যদি তেলের দাম কমতে থাকে, তবে এই সুবিধা তো ইতোমধ্যে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা পেতে শুরু করেছেন। তাহলে সামান্য ছাড় দিতে বাধা কোথায়?

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীসহ শহরতলির বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণকালে ৭০ শতাংশ আসন গড় বোঝাই ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বাকি ৩০ শতাংশ আসনের ভাড়া ৭০ শতাংশ যাত্রীরা পরিশোধ করে। এই ৩০ শতাংশ আসনে ছাত্র-ছাত্রী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের হাফ ভাড়া নেওয়া যায়। বাস ভাড়া নির্ধারণী বৈঠকে বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের এই প্রশ্নটি করার কেউ কি নেই?

বাসে হাফ পাসের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের মধ্যেই কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করেছে। তাহলে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো দায় নেই? আমি মনে করি, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মালিক-শ্রমিক পক্ষ থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অভিভাবক- সব পক্ষের দায় রয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো- সরকারপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বাস ভাড়া মেনে নেওয়ার পর হঠাৎ করে শ্রমিকরা কেন শিক্ষার্থীদের অর্ধেক বাস ভাড়া নিয়ে আপত্তি তুললো? সর্বশেষ বাস ভাড়া বাড়ানোর পর পরিবহন শ্রমিকরা প্রথমে আপত্তি তুলেছিল মালিকদের নেওয়া ওয়েবিল কমানোর জন্য। অর্থাৎ প্রতিটি বাস থেকে মালিক পক্ষ কোম্পানি পরিচালনার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে। এতে চুক্তিতে নেওয়া বাস শ্রমিকদের দিন শেষে পারিশ্রমিক তেমন থাকে না। যে কথা আমি আগেও উল্লেখ করেছি।

সেইসঙ্গে বাস্তায় পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধেরও দাবি ওঠে যুগের পর যুগ নিয়োগপত্র ও মাসিক বেতন ছাড়া কাজ করা পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের সেই দাবি পূরণ হয়নি। মালিকপক্ষের চাপে সব সময় পরিবহন শ্রমিকরা পিছু হটেছে। মালিকদের কাছে যেখানে সরকার অসহায়, সেখানে শ্রমিকরা কতোটুকু দাবি আদায় করতে পারবে? এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো- মালিকপক্ষের কাছ থেকে শ্রমিকরা দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে না তো?

অথচ কোনো পক্ষই এ কথা ভাবছে না- শিক্ষার্থীদের যদি হাফ ভাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে এই সুবিধা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সন্তানরাও ভোগ করবে। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা তো দূরপাল্লার রুটে হাফ ভাড়া দাবি করছে না। অভ্যন্তরীণ রুটে তাদের এ দাবি কি একেবারেই অযৌক্তিক? মূল কথা হলো, পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ ও গোটা পরিবহন সেক্টরকে নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করা সম্ভব না হলে এসব বিষয় সমাধান করা কষ্টসাধ্য। 

নূরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী থাকা অবস্থায় সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল রাজধানীর যানজট নিরসনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিস চালু করবে। উন্নত অনেক শহরে এ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত খুব একটা কার্যকর হয়নি। হলে আজকের এই সমস্যা হতো না। এতে রাস্তায় প্রাইভেট কারের সংখ্যাও কমতো।

বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়। জার্মানিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট অঞ্চলে যাতায়াত ফ্রি। এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের একটি পাস দেয়। ইউরোপের অনেক দেশে এ নিয়ম আছে। অনেক দেশে বেসরকারি গণপরিবহনের সঙ্গে সরকারের চুক্তি থাকে। অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন সার্ভিস চালু করা হয়। এ দিক থেকে আমরা পিছিয়ে। উল্টো অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। নইলে তেলের দাম কমলেও এ নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? রাস্তায় পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ নেই কেন? বাস-মালিকরা দিনের পর দিন শোষণ করছেন শ্রমিকদের- এ নিয়েও কোনো কথা শোনা যায় না। এসব কারণে যে ক্ষতির সম্মুখীন হন পরিবহন শ্রমিকরা সেই ক্ষতি মেটাতে তারা শিক্ষার্থীদের পকেটে হাত দিচ্ছেন না তো? যদি মালিকপক্ষের শোষণ ও রাস্তায় চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় তাহলে ছাত্রদের হাফ পাস বাস শ্রমিকদের জন্য বড় কোনো ইস্যু হওয়ার কথা নয়। 


লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক


 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়