ঢাকা     শুক্রবার   ০৮ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৫ ১৪৩৩ || ২০ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রৈবিক মিথ ও বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ

অনার্য মুর্শিদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১৭, ৮ মে ২০২৬  
রৈবিক মিথ ও বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ

বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা ‘অতিশয়োক্তি’ আর ‘বিশেষণ’ দিতে যতটা পটু, সত্য হজম করতে ঠিক ততটা নই। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা যে ‘বিশ্বকবি’ বা ‘কবিগুরু’র মিথ তৈরি করেছি, তা আদতে আমাদেরই বুদ্ধিবৃত্তিক হীনম্মন্যতা আর যুক্তিবাদী হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। পরিষ্কার করে বলা ভালো—রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবিও নন, কবিগুরুও নন, এমনকি আধুনিকতাবাদের মানদণ্ডে তিনি ‘আধুনিক কবি’ও নন। আজ সময় এসেছে সেই অতি-মানবিকরণের পর্দা সরিয়ে সত্যকে নির্মোহভাবে দেখার।

দুই বাংলাতে রবীন্দ্রনাথের একটি উপাধির নাম কবিগুরু। কিন্তু কবিতা তো কোনো ধর্ম নয় যে তার একজন নির্দিষ্ট গুরু থাকবে। এই উপাধিটি মূলত বাঙালির সেই পুরোনো পুঁথি সাহিত্য বা ভজনকাব্যের ‘অতি-মানবিকরণ’ বা দেবতুল্য করার অভ্যাসেরই একটি মার্জিত রূপ। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য বা বৈষ্ণব পদাবলীতে আমরা যেভাবে দেবতাকে বন্দনা করতাম, আধুনিক যুগে এসে ঠিক একইভাবে রবীন্দ্রনাথকে বন্দনা করছি। এটি আমাদের সমালোচনা করার ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। আমরা যখন কাউকে ‘গুরু’ মেনে নিই, তখন তাঁর সৃষ্টিকে বিচার করার যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলি। এই ‘পূজা’ করার মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় ‘রবীন্দ্র-মৌলবাদ’। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রশ্নহীন আনুগত্য কখনো সাহিত্যের মানদণ্ড হতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ বলি কেন আমরা? অনেকে নানান রকম যুক্তি দাঁড় করাতেই পারেন। কিন্তু পৃথিবীর বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারে হোমার, দান্তে, রুমি বা শেক্সপিয়রের মতো যারা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন, তাঁদের পাশে রবীন্দ্রনাথ কেবল একটি বিশেষ অঞ্চলের ও দর্শনের প্রতিনিধি। তাঁকে ‘বিশ্বকবি’ বলা মানে অন্য সকল মহান কবির অবদানকে অস্বীকার করে নিজেদের কূপমণ্ডূকতা প্রকাশ করা। প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব শ্রেষ্ঠ কবি থাকেন—ইংরেজদের শেক্সপিয়র, জার্মানদের গ্যেটে কিংবা পারস্যের হাফিজ-রুমি। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে একজনকে ‘বিশ্ব’ তকমা দেওয়া আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতারই পরিচয় দেয়। এটি মূলত নিজেদের হীনম্মন্যতা ঢাকার একটি চেষ্টা, যেখানে আমরা একজনকে দিয়ে নিজেদের বিশ্বদরবারে জাহির করতে চাই।

রবীন্দ্রনাথ কি আধুনিক কবি? আধুনিকতাবাদ (Modernism) মানেই হলো জীবনের রুক্ষতা, নাগরিক যন্ত্রণা আর খণ্ডতাকে চেনা। ১৯২২ সালে টিএস এলিয়ট যখন তাঁর The Waste Land মহাকাব্যে আধুনিক সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ আর মানুষের আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে ফুটিয়ে তুলছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখনো তাঁর সাজানো-গোছানো, মার্জিত আর আধ্যাত্মিক জগতে বাস করতেন। এলিয়টের কবিতায় যে ভাঙাচোরা সমাজ আর মানুষের অস্তিত্বের সংকট প্রকাশিত হয়েছিল, রৈবিক কাব্যভাষায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আমরা যে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ বা গভীর নির্জনতা দেখি, কিংবা বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় যে তীব্র নাগরিক যন্ত্রণা খুঁজে পাই, রবীন্দ্রনাথ সেখানে অনুপস্থিত। তাঁর কবিতা আজ আর সময়ের রূঢ় দাবির সাথে টিকে নেই; আধুনিক মানুষের অস্থিরতা, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব বা জটিল অস্তিত্ববাদ প্রকাশে রৈবিক অলঙ্কার আজ ক্লান্ত এবং সেকেলে।

বর্তমানে রবীন্দ্রনাথের আসল শক্তি তাঁর কবিতায় নয়, বরং তাঁর সংগীতে। তাঁর কবিতা সময়ের নিয়মে আধুনিক মানুষের কাছে ফিকে হয়ে এলেও গানগুলো আমাদের নির্ঘুম রাতের পরম সঙ্গী। নতুন প্রেমে পড়লে কিংবা প্রেম ভাঙলে—রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমরা আর সেইরকম কারো কাছে যেতে পারি না। বাঙালির হৃদস্পন্দনের প্রতিটি সূক্ষ্ম কম্পন তিনি তাঁর সুরে বেঁধেছেন। তিনি শব্দের চেয়ে সুরের মাধ্যমে মানুষের অবচেতন মনের অনেক বেশি গভীরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এই সুরের মায়াজালে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, সেখানে তিনি কোনো কৃত্রিম উপাধির মুখাপেক্ষী নন। প্রতিটি ঋতুতে প্রতিটি অনুভূতিতে রবীন্দ্রনাথ এখনো উপস্থিত। গানই তাঁকে প্রকৃত অর্থে বাঙালির অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে রেখেছে।

কবিতায় কিছুটা দূরবর্তী বা আধ্যাত্মিক মনে হলেও ছোটগল্প ও উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি এবং বাস্তববাদী। তাঁর ছোটগল্পগুলো বাংলার গ্রামীণ সমাজ, মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাওয়া না-পাওয়া এবং প্রকট সামাজিক বৈষম্যের এক শক্তিশালী আখ্যান। ‘পোস্টমাস্টার’ থেকে ‘কাবুলিওয়ালা’—সর্বত্রই তিনি সাধারণ মানুষের না বলা কথাগুলো তুলে এনেছেন। আবার ‘গোরা’, ‘চোখের বালি’ বা ‘যোগাযোগ’-এর মতো উপন্যাসে তিনি যে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও নারী জাগরণের ইঙ্গিত দেখিয়েছেন, তা তৎকালীন সময়ের তুলনায় ছিল অনেক অগ্রগামী। মানুষের জটিল সম্পর্কের বয়ান এবং রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোকে ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষমতা তাঁকে একজন শক্তিশালী গদ্যকার হিসেবে আজীবন প্রাসঙ্গিক রাখবে।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা তাঁর জীবনের সবচেয়ে আধুনিক এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়। তৎকালীন সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নন্দলাল বসুরা যখন ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবাদী ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে ব্যস্ত ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন সেই গণ্ডি ভেঙে বিমূর্ত এবং অদ্ভুতুড়ে সব রূপ তৈরিতে মেতেছিলেন। বাংলার প্রচলিত চিত্রকলার ধারা—যেখানে পরিচ্ছন্নতা এবং অলঙ্করণই শেষ কথা ছিল—রবীন্দ্রনাথ তা সচেতনভাবে ভেঙে দিয়েছেন। তাঁর রেখা ও রঙের মধ্যে যে অসংলগ্ন, কর্কশ ও নির্ভীক শক্তি ছিল, তা-ই মূলত আধুনিকতাবাদের প্রকৃত চেতনার প্রতিফলন। তিনি তথাকথিত ‘সুন্দর’কে অস্বীকার করে আদিম অন্ধকার ও অন্তর্জগত ফুটিয়ে তুলে বাংলার চিত্রকলার এক নতুন ও স্বাধীন ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না, এ কথা আমরা সবাই জানি। তিনি দূরদর্শী সমাজ-সংস্কারকও ছিলেন। গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে তাঁর সমবায় আন্দোলনের চিন্তা এবং কৃষকদের উন্নয়নে পতিসরে নেওয়া তাঁর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ আজও অনুকরণীয়। শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল এক বিশ্বজনীন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তবে বর্তমান সময়ে শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করে যে অন্ধ আনুষ্ঠানিকতা এবং ‘গুরু’ প্রথার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। তাঁর কর্মযজ্ঞকে পূজা না করে তাঁর দর্শনের প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

সময় এসেছে রবীন্দ্রনাথকে ‘দেবতা’র আসন থেকে নামিয়ে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে দেখার। তাহলেই হয়তো পূজা বন্ধ হবে, উঠে যাবে রবীন্দ্র-মৌলবাদ। প্রগতিশীলতার উপরে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক কারণ হয়তবা আমাদের এই রবীন্দ্র-মৌলবাদী আচরণ। যেরকম উগ্র ধর্মীয় বক্তাদের কারণে অনেকে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন, তেমনি অতি-মানবিকরণের ফলে নতুন প্রজন্ম সাহিত্যবিমুখ হতে পারে। অতি-মানবিকরণের পর্দা সরিয়ে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর প্রকৃত অবদানের নিরিখে মূল্যায়ন করাই হবে প্রকৃত যুক্তিবাদ। রবীন্দ্রনাথ কেন, অন্ধ আবেগকে এক পাশে রেখে নজরুল বিষয়েও প্রশ্ন করার এখনই সময়। প্রশ্নেই তৈরি হতে পারে যুক্তি, যুক্তিতেই মুক্তি।

লেখক: গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়