ঢাকা, রবিবার, ১১ মাঘ ১৪২৬, ২৬ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৩ ১:৫৩:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৩ ৩:২৪:১৮ পিএম

কনকনে শীত। শীতের তীব্রতায় ঘরের বাইরে বের হওয়া দায়। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে প্রকৃতি। শীতের কাঁপুনিতে বেঁকে যায় দেহ। শরীরের চামড়া, রক্ত-মাংস সব নিস্তেজপ্রায়! তারপরও শীত গ্রামবাংলায় ভিন্ন আমেজ নিয়ে হাজির হয়। এ সময় গৃহস্তের ঘরে নতুন চালের পিঠা তৈরি হয়। খেজুরের রসের পিঠাও তৈরি করেন অনেকে। অর্থাৎ রসনা মেটানোর ভিন্ন আয়োজন শীতে চোখে পড়ে।

শীতে আরেকটি উপাদেয় খাবার হাঁসের মাংস। এ সময় হাঁসের শরীরে চর্বি হয়। এই চর্বি শরীর গরম রাখে বলেই ভোজন রসিকদের ধারণা। ভোজন রসিকদের চাহিদা মেটাতে অনেকে শীতের আগে আগে হাঁস পালন করেন। লক্ষ্মীপুর জেলার পূর্ব সীমানায় ভুলুয়া নদীর চরে তেমনই একজন হাঁসচাষী কামাল উদ্দিন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় তিনি এই শীতে প্রায় বারোশ হাঁসের একটি খামার গড়ে তুলেছেন।

কামাল উদ্দিনের বয়স ৪৫ পার হয়েছে। এলাকায় ‘পাখি বেপারী কামাল’ নামে তিনি পরিচিত। অন্যকিছু করেন না। কেবল পশুপাখি লালন-পালন আর বাজারজাতকরণই তার জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। মৌসুম বুঝে তিনি খামার করেন। করুণানগরের ভুলুয়া নদীর বড় সাঁকো পার হয়ে চরের পথ ধরে কিছুদূর হেঁটে গেলেই কামাল উদ্দিনের খামার। তিনি নিজেই হাঁসগুলোর দেখাশোনা করেন। কথা বলে জানা গেল এই হাঁসই এখন তার জানপ্রাণ। ডোবা অথবা খালে যখন হাঁসগুলো সাঁতার কাটে তখন তৈরি হয় অন্যরকম এক দৃশ্য। চোখজুড়ে কেবল হাঁস আর হাঁস! হাঁসের প্যাক্‌প্যাক্‌ শব্দে কান পাতা দায়। 

কামাল উদ্দিন বলেন, আমি হাঁসের ছোট বাচ্চা কিনি। আজ ৫-৭ বছর হলো এভাবেই শীতে হাঁস চাষ করছি। প্রতিটি হাঁস বিক্রি করি পাঁচশ টাকা। একদাম। কোনো দামাদামি নাই। আমার হাঁস লক্ষ্মীপুর থেকে শুরু করে তোরাবগঞ্জ,  লরেঞ্চ, হাজিরহাট, করুণানগর, আলেকজান্ডারসহ অনেক জায়গায় বিক্রি হয়।’

হাঁস চাষে এত আন্তরিকতা কেন? জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন বলেন, ‘অনেক লাভ, অনেক উন্নতি। এই যে আমি ৫-৭ বছর ধরে হাঁস চাষ করছি, এজন্য চর এলাকা বেছে নিয়েছি। আমার পরিবারের পাঁচজন সদস্য, সবাই হাঁসের দেখাশোনা করে। আমি কৃষিকাজ করি না। শুধু হাঁসের পেছনে লেগে থাকি। হাঁসের পাশাপাশি পাখির ব্যবসা করি। হাঁস থেকে যে ডিম পাব, ডিম দিয়ে আবার বাচ্চা ফুটাব। অর্থাৎ চক্রাকারে এভাবে চলতে থাকবে। এ বছর আমি এখান থেকে দুই লাখ টাকা আয় করতে পারব। এতে আমার সংসার খুব ভালোভাবেই চলে যাবে। ডিম তো আছেই। খেতেও পারি, চাইলে বিক্রিও করতে পারি।’ 

গরু, মুরগি, ছাগল বাদ দিয়ে শুধু হাঁস কেন? কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এ দিকে শীতে প্রতি বছর হাঁস খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেক সময় হাঁসের অভাবও হয়। এ কারণে আমি শীত টার্গেট করে হাঁস চাষ করি। এভাবে যত্নসহকারে কেউ হাঁস পালন করতে পারলে তার আর কোনো অভাব থাকবে না। সে অবশ্যই স্বাবলম্বী হবে। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আমি কখনও কাজ খুঁজিনি। সামান্য যা টাকা ছিল এর পেছনে লগ্নি করেছি।’

কামাল উদ্দিন বেকার যুবকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘জীবন নিয়ে হতাশ না হয়ে হাঁসের বাচ্চা কিনে একটু যত্নসহকারে লালন-পালন করুন, দেখবেন কষ্ট দূর হবে। তখন আপনিও অনেক সুখে থাকবেন।’ 

কথা হয় ভুলুয়াপাড়ের তরুণ মো. ইলিয়াছের সঙ্গে। ইলিয়াছ বলেন, ‘ শীত এলেই আমরা হাঁস খাই। শীতে হাঁসের শরীরে অনেক পুষ্টি, চর্বি জমা হয়। এ জন্য শীতকালে হাঁস খেলে শরীরে বল, বুদ্ধি হয়। বাড়িতে তো বটেই বন্ধুরা মিলে আমরা হাঁস পার্টি দেই। পিকনিক করি। সে ক্ষেত্রে হাঁসের যে চাহিদা, সেটা মেটানোর জন্য কিন্তু আমরা কামাল উদ্দিনের কাছেই যাই। তার হাঁস চাষের এই উদ্যোগ খুবই সময় উপযোগী। কামাল সত্যি কামাল করেছে!’ 

শীতে সম্প্রতি এই অঞ্চলের তরুণেরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে হাঁস পার্টির আয়োজন করে। অনেক সংগঠনকেও দেখা যায় সবাই মিলে হাঁস পার্টি করতে। অর্থাৎ হাঁসের মাংস রান্না করে খাওয়া।  আর এই হাঁসের চাহিদা মেটাতে কামাল উদ্দিনের মতো চাষীরা রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।


ঢাকা/তারা