ঢাকা     শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২২ ১৪৩৩ || ১৯ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বিশ্বমঞ্চে উপকূলের গল্প বলে শাহীন আলম

শরিফুল ইসলাম রিফাত, গবি সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫৪, ৫ জুন ২০২৬  
বিশ্বমঞ্চে উপকূলের গল্প বলে শাহীন আলম

বিশ্ব পরিবেশ দিবস এলেই প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে যখন আলোচনা-পর্যালোচনা চলে, তখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার গল্প অনেক সময়ই আড়ালেই থেকে যায়। অথচ প্রতিটি জলোচ্ছ্বাস, প্রতিটি ভাঙন আর প্রতিটি লবণাক্ততার পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের জীবনকথা।

সেই গল্পগুলো দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার তরুণ জলবায়ু কর্মী এসএম শাহীন আলম। উপকূলের দুঃখ-দুর্দশা, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং জলবায়ু সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘উপকূল এক্সপ্রেস’ নামে।
উপকূলেই বেড়ে ওঠা

শাহীন আলমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাতক্ষীরার দ্বীপ ইউনিয়ন পদ্মপুকুরে। নদী, জোয়ার, ঝড় আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে যার শৈশবের পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। আইলা, বুলবুল, আম্ফানসহ অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব কাছ থেকে দেখেছেন। দেখেছেন ঘর হারানো মানুষ, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন আর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া জীবিকা।

শাহীন আলম

দুর্যোগের পর তিনি ছুটে গেছেন উপকূলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করেছেন, কখনো শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন পুষ্টিকর খাবার ও খেলনাসামগ্রী। গর্ভবতী নারীদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, আবার কিশোরীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন স্যানিটারি ন্যাপকিন। উপকূলবাসীর কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

জলবায়ু সংকটের কণ্ঠস্বর

শুধু মানবিক সহায়তায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি শাহীন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলবাসীর কথা দেশ-বিদেশে তুলে ধরার কাজও করে চলেছেন সমান নিষ্ঠায়। তার বিশ্বাস, নিজেদের গল্প নিজেদেরই বলতে হবে।

উপকূলের অস্বাভাবিক পরিবেশ, প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া প্রকৃতি এবং মানুষের সংগ্রামই তাকে একজন জলবায়ু কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছে। এ বিষয়ে শাহীন বলেন, “এটা উপলব্ধি করতে পারি যে আমরা নিজেরা না দাঁড়ালে কেউ আমাদের পক্ষে লড়বে না।”

বর্তমানে তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

বিশ্বমঞ্চে উপকূলের প্রতিনিধিত্ব

বর্তমানে বেড়েছে শাহীনের কর্মপরিধিও। ২০২৪ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ব্যাজ নিয়ে ন্যাচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম) অর্থায়নে কপ-২৯-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি।
আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের কথা। বিশ্বনেতাদের সামনে বলেছেন এমন মানুষের গল্প, যাদের প্রতিদিনের জীবন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে।

শাহীনের ভাষায়, “এটা শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ছিল না, বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার সংকটের গল্প বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার একটি বিরাট সুযোগ।”

বাঁচা-মরার লড়াইয়ের গল্প

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করা ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।

শাহীন বলেন, “এটা এখন বাঁচা-মরার লড়াই। এই সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে আমাদের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে দাবি একটাই—উন্নত দেশগুলো যেন তাদের অতীতের ভুলগুলোর মাশুল আমাদের ওপর চাপিয়ে না দেয়।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব

মাঠপর্যায়ের কাজের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় শাহীন আলম। পরিবেশ, জলবায়ু ও উপকূলসংক্রান্ত নানা বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখছেন, বলছেন এবং সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাস্তবতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উপকূলের মানুষের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরছেন ধারাবাহিকভাবে।
বর্তমান সংকটের চিত্র

উপকূলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শাহীন বলেন, “গ্রীষ্ম মৌসুমে অনেক এলাকায় পুকুর, খাল ও জলাশয় শুকিয়ে যায়। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের অনেক টিউবওয়েলে পানি ওঠে না, আর উঠলেও তা লবণাক্ত হয়। ফলে বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষকে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অনেক পরিবার অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় পানিও কিনতে পারে না।”

তার মতে, খাবার পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির সংকট বর্তমানে উপকূলের মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে নদীর পানিতে গোসল করতে হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।

টেকসই উদ্যোগের প্রয়োজন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন শাহীন। তিনি মনে করেন, নদী খনন, বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

তার মতে, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, বন উজাড়ও বন্ধ করতে হবে। একইভাবে নদী রক্ষার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

স্বপ্ন ও প্রত্যাশা

শাহীন আলমের স্বপ্ন খুব সহজ, কিন্তু গভীর। তিনি চান, উপকূলের শিশুরা জন্মের পর থেকেই মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পাক। উপকূলের মানুষ যেন আর বাস্তুচ্যূত না হয়, ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনে ঠেলে না দেওয়া হয়।

তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে আশার আলো দেখাবে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুত অনুদান ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণের হার কমিয়ে শূন্যের কাছাকাছি আনার কার্যকর উদ্যোগও নিতে হবে।

উপকূলের সন্তান শাহীন আলমের এই লড়াই মূলত নিজের জন্য নয়; বরং সেই সব মানুষের জন্য, যাদের জীবন প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে নতুন করে বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তার গল্প তাই কেবল একজন তরুণের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের উপকূলের বেঁচে থাকার গল্প।

শিক্ষকের চোখে শাহীন

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা সুলতানা বলেন, “শাহীন আলম আমার ছাত্র। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এত অল্প বয়সে উপকূলের মানুষের জন্য তার যে দায়বদ্ধতা ও কাজ করার আগ্রহ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সে যেমন দায়িত্বশীল, তেমনি একাডেমিকভাবেও খুব ভালো। পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও পরিবেশ নিয়ে তার চিন্তা সবসময় আমাকে মুগ্ধ করে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৯-এ অংশ নিয়ে সে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। একজন তরুণ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপকূলের মানুষের কথা বলার এই সক্ষমতা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।”

তিনি আরো বলেন, “শাহীন শুধু জলবায়ু নিয়ে কথা বলে না, বাস্তব ক্ষেত্রেও কাজ করে। বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে তার সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। মানুষের জন্য কিছু করার এই মানসিকতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার কাজকর্ম দেখে আমিও অনুপ্রাণিত হই। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে শাহীন আলম উপকূলের মানুষের কল্যাণে এবং দেশের জন্য আরো বড় পরিসরে কাজ করবে। তার জন্য আমার শুভকামনা রইল।”

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়