Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০৪ আগস্ট ২০২১ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৮ ||  ২৩ জিলহজ ১৪৪২

নীরব মহামারি: বাংলাদেশের পরিস্থিতি নাজুক

হাসান মাহামুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ২০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ২১:০০, ২০ জুলাই ২০২১
নীরব মহামারি: বাংলাদেশের পরিস্থিতি নাজুক

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চলতি বছর পানিতে ডুবে মৃত্যুকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিষয়টিকে বর্তমান বিশ্বের একটি নতুন বৈষম্য হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, বিশ্বে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সিংহভাগই হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশে এ ধরনের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হলেও সচেতনতা সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। এমনকি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি এখনো খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ, এর সঙ্গে দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনও জড়িত।

চলতি বছর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হতে যাচ্ছে ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ’ দিবস। প্রতি বছরের ২৫ জুলাই দিবসটি পালন করা হবে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের প্রস্তাবে গত ২৮ এপ্রিল পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধবিষয়ক এ সংক্রান্ত রেজুলেশন সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। রেজুলেশনে পানিতে ডুবে মৃত্যুকে একটি ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের ৭৫ বছরের ইতিহাসে এ ধরনের রেজুলেশন এটাই প্রথম।

বাংলাদেশের প্রস্তাবটি গ্রহণ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি এবং জাতীয় পদক্ষেপকে উৎসাহিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবতা হচ্ছে খোদ বাংলাদেশেই এ বিষয়ে সচেতনতা এখনও অসন্তোষজনক পর্যায়ে আছে। জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু (১ থেকে ৫ বছর বয়সী) পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে।

রেজুলেশন উপস্থাপনকারী জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা এ বিষয়ে বলেন, ‘পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় না আনা গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের সাফল্য অর্থাৎ এসডিজি-৩ অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে এবং এশিয়ায় এ হার সবচেয়ে বেশি। পানিতে ডুবে মৃত্যু কেবল দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি বৈষম্য। আর যাতে কোনো মূল্যবান জীবন পানিতে ডুবে নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার।’

ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার (আইডিআরসি) বাংলাদেশের ডিরেক্টর ড. আমিনুর রহমান বলেছেন, ‘অনেকের মাঝে ধারণা সৃষ্টি হয়ে গেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু সাধারণ মৃত্যু। এমনকি গ্রামের মানুষ এখনো মনে করে, এই মৃত্যুগুলো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একটু সচেতন হলেই এসব মৃত্যু অনেকটাই রোধ করা যায়, এটি তারা মনে করে না।‘

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক পর্যায় ছাড়ালেও জনসাধারণের সচেতনতা বাড়েনি। পানিতে ডুবে প্রাণহানি রোধে সবার আগে সচেতনতা জরুরি। শুধু পানিতে ডুবে বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫০ জনের মৃত্যু হয়। এর সবচেয়ে থেকে বড় কারণ—অধিকাংশ ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে মৃত্যুকে মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরে নেয়।’

গণমাধ্যম ও উন্নয়ন যোগাযোগ সংগঠন সমষ্টির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে ৮৭৫টি ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ১৬৪ শিশুসহ ১ হাজার ৪০২ জন পানিতে ডুবে মারা গেছে। পানিতে ডুবে মৃতদের ৮৩ শতাংশই শিশু।

এদিকে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর যত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় বলে জানা গেছে। শিশু মৃত্যুর কারণ হিসেবে এ ধরনের মৃত্যু থানা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং নিকটবর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তালিকাভুক্ত করার নিয়ম থাকলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ‌্যা আরও বেশি।

পানিতে ডোবার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং শিশুদের দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা) পর্যন্ত দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখার মধ্যে সমাধান দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি, এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ বছর বয়সে শিশু সাঁতার শেখার উপযুক্ত হয়। শিশুদের যদি দিনের ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে পানি থেকে দূরে রাখা যায়, তাহলে বিপদ এড়ানো সম্ভব। এ চিন্তা থেকে বেশ কয়েকটি জেলায় প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিআইপিআরবি। প্রতিষ্ঠানটি দেখেছে, ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে শিশুদের রাখলে ৮০ শতাংশ এবং সাঁতার শেখালে ৯৫ শতাংশ মৃত্যু কমানো সম্ভব।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘সরকারের দিক থেকেও এ ধরনের প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের সাঁতার শেখার বিষয়ে আগ্রহী করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বর্ষাকালে গ্রামীণ এলাকায় বাড়িঘরের চারপাশ যখন জলমগ্ন হয়, তখন বিপদের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে, এ সময়ে সচেতনতামূলক প্রচার চালালে অনেক শিশুকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।’

ঢাকা/হাসান/রফিক

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়