ঢাকা     শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২১ ১৪৩২ || ১৫ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

টিকা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, পুষ্টিহীনতায় বাড়ছে হামে মৃত্যু

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৩৮, ৩ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ২২:৪২, ৩ এপ্রিল ২০২৬
টিকা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, পুষ্টিহীনতায় বাড়ছে হামে মৃত্যু

ছবি: রাইজিংবিডি

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই প্রাণ গেছে ৩৩ জনের। তবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য একত্র করলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, মারা যাওয়া শিশুদের বেশিরভাগই হামের পাশাপাশি পুষ্টিহীনতাজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিল।

আরো পড়ুন:

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের ৫০ জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, যেখানে চলতি বছরই ২৭ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মহাখালীর ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছর ভর্তি হয়েছে প্রায় ৬০০ শিশু। অথচ গত বছর পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯। শুধু মার্চ মাসেই ভর্তি হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিশু, যা সংক্রমণের দ্রুত বিস্তারকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে গাফিলতি। ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে, অর্থাৎ ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। গত এক দশকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন হার।

এর আগের বছরগুলোতে টিকাদান কভারেজ ছিল প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও এই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এত বড় পতন বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে নানা সমস্যার কারণে এই ব্যত্যয় তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা টিকাদান কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে নিয়মিত টিকাদান সূচির বাইরে বিপুলসংখ্যক শিশু থেকে গেছে, যারা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত আশপাশের আরো অনেক শিশু সংক্রমিত হতে পারে। টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ শুরু হলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে বড় আকার ধারণ করে বর্তমানে ঠিক সেটিই ঘটছে।

এদিকে, বয়সভিত্তিক ঝুঁকির বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ৬ মাস বা তারও কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “জন্মের পর মায়ের শরীর থেকে যে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুর শরীরে যাওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে তা পর্যাপ্তভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে টিকা নেওয়ার আগেই শিশুরা সংক্রমণের মুখে পড়ছে। এছাড়া যারা আংশিক টিকা নিয়েছে বা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দ্বিতীয় ডোজ পায়নি, তাদের মধ্যেও ঝুঁকি রয়ে গেছে।”

তিনি আরো বলেন, “সময়ের সঙ্গে টিকার কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি এলাকায় ভাইরাস সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে পুষ্টিহীনতাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।”

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে তারা সহজেই সংক্রমিত হয় এবং নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা চোখের সমস্যার মতো জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী রবিবার থেকে সারা দেশে মাসব্যাপী এই ক্যাম্পেইন শুরু হবে। এর মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে ইউনিসেফের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি থেকে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হবে, যা নিয়মিত টিকাদান সূচির বাইরের একটি বিশেষ উদ্যোগ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

ঢাকা/এমএসবি/এসবি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়