ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪৩৩ || ১০ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ট্যানারি শিল্প সংকটে, সিন্ডিকেটমুক্ত চান মালিকেরা

রায়হান হোসেন, ঢাকা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৫২, ২৬ মে ২০২৬   আপডেট: ২২:৫৩, ২৬ মে ২০২৬
ট্যানারি শিল্প সংকটে, সিন্ডিকেটমুক্ত চান মালিকেরা

ছবি: রায়হান হোসেন

ট্যানারি শিল্পে একের পর এক সংকটের কারণে এবারো কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন মালিকরা। মঙ্গলবার (২৬ মে) রাজধানীর ট্যানারি মোড় হাজারীবাগ এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারো দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় তারা।

ট্যানারি মালিকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, কেমিক্যালের আকাশছোঁয়া দাম, ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং আন্তর্জাতিক বায়ারদের অবহেলায় দেশের বৃহত্তম এই রপ্তানি খাতটি এখন এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় ইউরোপের বাজার হারিয়ে ঢাকার মালিকেরা যখন একচেটিয়া সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি।

আরো পড়ুন:

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এবার তুলনামূলকভাবে পশু কোরবানি কিছুটা কম হতে পারে। সেই সমীকরণ মাথায় রেখে গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা কমিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ভেতরের কোরবানির চামড়ার প্রায় ৮০ শতাংশ তারা সরাসরি আড়ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনবেন। তবে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একের পর এক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকট। আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় ইউরোপের বাজার হারানোর পর এখন মূলত চীনা ক্রেতাদের সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ঢাকার মালিকদের।

শত সংকটের মধ্যেও রাজধানীর ট্যানারি মোড় ও হাজারীবাগে এখনো কিছু ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে চালিয়ে যাচ্ছে। তাদেরই একজন মো. সাজিদুর রহমান। তিনি বলেন, “মালিকেরা এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের বড় টার্গেট নিছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের আড়তদারদের অবস্থা খুব শোচনীয়। ঢাকার বড় ট্যানারি মালিকেরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া বিক্রি করতে না পারে, তবে আমাদের কাছ থেকে নগদ টাকায় চামড়া সময়মতো কিনবে কীভাবে? আড়তে শ্রমিক রেডি করে বসে আছি। কিন্তু বড় মালিকদের হাত খালি থাকলে আমরা কাঁচা চামড়া আড়তে ধরে রাখতে পারব না। গত বছরও লোকসান দিছি, এবারও চামড়া সংগ্রহ নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশায় আছি।”

রাজধানীর হাজারীবাগের আরেক ট্যানারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চামড়া শিল্পের এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো কেমিক্যালের দাম আর বিদ্যুৎ। ঢাকার ট্যানারিগুলোতে একবার উৎপাদন শুরু হলে টানা ১৬ থেকে ৭২ ঘণ্টা ড্রাম সচল রাখতে হয়। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার কাঁচা চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে কিছুটা কমার সম্ভাবনা আছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের বাজারে এখন কোনো বিকল্প বা কম্পিটিশন নেই। ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় বায়াররা আমাদের চামড়া কেনা বন্ধ করে দেওয়ায় চীনের কিছু ব্যবসায়ী একটা সিন্ডিকেট বানাইছে। তারা জানে আমাদের চামড়া নেওয়ার কেউ নাই, তাই পানির দরে আমাদের মাল কেনে। ঢাকার মালিকরা এই চীনা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। আন্তর্জাতিক এই বাজার সিন্ডিকেট যদি সরকার কূটনৈতিকভাবে না ভাঙতে পারে, তবে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের গদি বন্ধ করে দিতে হবে।”

ঈদের পর প্রথম ১০ দিন ঢাকার বাইরে থেকে কাঁচা চামড়া ঢাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার সরকারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ট্যানারি মালিকেরা। তারা বলছেন, এতে ঢাকার চামড়াগুলো প্রথমে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে, যা সীমিত সক্ষমতার ওপর হুট করে অতিরিক্ত চাপ পড়া কমাবে। তবে চামড়ার গুণগত মান ঠিক না থাকলে এবং কেমিক্যালের উচ্চমূল্য বজায় থাকলে কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নামার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সরকারি প্রণোদনা ছাড় করা দাবি ট্যানারি মালিকদের।

এদিকে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৭ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখের বেশি। সম্ভাব্য কোরবানির সংখ্যা ১ কোটির ওপরে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এবারের চামড়া সংগ্রহসহ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “এবারের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে আমি মনে করি। সরকার প্রায় ১৭ কোটি টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রশাসনের সব স্তরে বিষয়টি তদারকি করা হবে এবং মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো যেন দ্রুত লবণ ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারে, সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এবার আমাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লাখ। চামড়ার দাম নির্ভর করবে মূলত গুণগত মানের ওপর। কোয়ালিটি ঠিক থাকলে অবশ্যই ভালো দাম পাওয়া যাবে, আর মান ঠিক না থাকলে সঠিক মূল্য মিলবে না এটাই বাস্তবতা।”

তিনি আরো বলেন, “কোরবানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বারবার বলা হচ্ছে, পশু জবাইয়ের সাত থেকে আট ঘণ্টার মধ্যেই চামড়ায় লবণ প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে বর্ষাকাল হওয়ায় বৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় চামড়া ভিজে থাকলে এর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বাজারমূল্যও কমে যেতে পারে। সঠিক সময়ে লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের চামড়া নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

ঢাকা/সাইফ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়