‘পাওয়ার হিটিং এমন নয় যে, লং অফ ও লং অন দিয়ে উড়িয়ে মারলেন’
সাইফুল ইসলাম রিয়াদ, চট্টগ্রাম থেকে || রাইজিংবিডি.কম
ক্রিকেট বিশ্বে ‘জুলু’নামে পরিচিত তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সফল অলরাউন্ডার ছিলেন। আগ্রাসী ব্যাটিং, নিয়ন্ত্রিত বোলিং আর তুখোড় ফিল্ডিং; তিনে মিলে দারুণ এক প্যাকেজ। বলা হচ্ছে ল্যান্স ক্লুজনারের কথা।
ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ফাস্ট বোলিংয়ে। ধীরে ধীরে বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান ক্লুজনারের আবির্ভাব হয়। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে সেরা ক্রিকেটার হয়েও দলকে ট্রফি জিততে না পারা তার চিরকালীন আক্ষেপ হয়ে আছে।
অবসরের পর কোচিং পেশাকে বেছে নিয়েছেন। টেস্ট খেলুড়ে দুই দেশ জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের কোচিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার আমলেই ক্রিকেট বিশ্বে আফগানদের আবির্ভাব ঘটে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বদৌলতে বাংলাদেশেও কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে ক্লুজনারের ঝুলিতে। রাজশাহীর কোচ থাকার পর চলতি বিপিএলে তার কাঁধে খুলনার দায়িত্ব।
রাইজিংবিডির সঙ্গে একান্ত আলাপনে ক্লুজনার তুলে ধরেন কোচিংয়ের নানা দিক। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতি নিয়ে দিয়েছেন নানা টোটকা। জানিয়েছেন কোচিংয়ের প্রস্তাব পেলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন। তার মুখেই শুনন বাকিটা ...
দ্বিতীয়বার কোচিংয়ের জন্য বাংলাদেশে এসেছেন। কেমন যাচ্ছে সবকিছু?
ল্যান্স ক্লুজনার: আবারও বাংলাদেশে ফিরে কাজ করাটা আমি খুবই উপভোগ করছি। কয়েক বছর আগে আমি রাজশাহী কিংসের সঙ্গে ছিলাম। আবারও ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। তবে জৈব সুরক্ষা বলয়ে থাকাটা হতাশাজনক। দুর্ভাগ্যজনক বাইরে আমি আমার পছন্দের জামা কাপড়ের দোকানে যেতে পারছি না। এটা ভালো যে ক্রিকেট হচ্ছে। আমাদের সবারই সেটার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
আপনার দল খুলনায় বাংলাদেশের দুজন তারকা ক্রিকেটার আছে। মুশফিক এবং সৌম্য। একজন নিয়মিত রান করেন আরেকজন বারবার সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হন। দুজনকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?
ল্যান্স ক্লুজনার: মিডল অর্ডারে মুশফিকের মতো একজন ক্রিকেটার আছে এটা ভালো ব্যাপার। সে দুর্দান্ত একজন ক্রিকেটার। তার ক্রিকেটীয় মেধা খুবই ভালো। এটার জন্য আমরা আনন্দিত। সর্বশেষ দুই ম্যাচে মুশফিক আমাদের জন্য দারুণ পারফরম্যান্স করেছে। এটা হতাশাজনক যে বাকি ক্রিকেটাররা তাকে সেভাবে সাপোর্ট দিতে পারেনি। কিন্তু এটাই ক্রিকেট খেলা। তবে পরবর্তী ম্যাচে এটা উতরে যেতে হবে। আর কয়েক বছর আগে রাজশাহী কিংসে সৌম্যও আমার সঙ্গে ছিল। এটা হতাশাজনক যে, সে ধারাবাহিক হতে পারছে না যা আমরা প্রত্যাশা করছি।
গত সপ্তাহে সে অবশ্য অসুস্থতা থেকে ফিরেছে। পর্যাপ্ত অনুশীলন করতে পারেনি যে কারণে পারফর্ম করাটা তার জন্য কঠিন। কিন্তু আমি কোনো অজুহাত দিতে চাই না। তার কাছে প্রত্যাশা অনেক। পরের কয়েক সপ্তাহে আমরা প্রচুর পরিশ্রম করবো যাতে সে আমাদের দলের জন্য অবদান রাখতে পারে।
সৌম্য অধারাবাহিক। বেশিরভাগ সময় আউট হয়ে যান শুরুতেই। সক্ষমতার অভাব দেখছেন কি না?
ল্যান্স ক্লুজনার: অবশ্যই, তার সেই সক্ষমতা রয়েছে। সে প্রমাণও করেছে। হয়তো দুই-একটা টেকনিক্যাল সমস্যা রয়েছে আর ওকে ধারাবাহিক হতে হবে। তার সঙ্গে কারও কাজ করতে হবে। কারণ আমি যথেষ্ট সময় পাচ্ছি না। তার কি সমস্যা হচ্ছে সেটা সময়ের কারণে শেখাতেও পারছি না। সত্য কথা বলতে সে দারুণ একজন ক্রিকেটার। মাঝে মাঝে পারফর্ম করার জন্য তাদের মানসিক অবস্থাটা সঠিক জায়গায় আনা দরকার।
আপনি এশিয়ার দল আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের দায়িত্বে ছিলেন লম্বা সময়। তারা খুব স্বল্প সময়ে উন্নতি করছে। আপনার বাংলাদেশেও কাজের অভিজ্ঞতা আছে। দুই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে পার্থক্য কী?
ল্যান্স ক্লুজনার: এটা ভালো প্রশ্ন। আমি আসলে জানি না বাংলাদেশের তরুণরা কিভাবে উঠে আসে। তবে আফগানিস্তান সম্পর্কে আমি জানি যে তারা গলির ক্রিকেট ও টেপ টেনিসে খেলে বাউন্ডারি মারার অভ্যস্ততা তৈরি করে আসে। যে কারণে দেখবেন তাদের বাউন্ডারি মারার সক্ষমতা বেশি। তারা এভাবেই সফল, আমিও তাদের এটার প্রতি নজর দিতেই উৎসাহিত দিয়েছি। তাদের সবাই বোলিং ও ব্যাটিং করতে পারে। আমি মনে করি আপনি গলির ক্রিকেট থেকে শিখতে পারবেন। যেটা আপনি জাতীয় দলেও কাজে লাগাতে পারবেন।আমি আসলে জানি না বাংলাদেশে কতটা গলির খেলা হয় কিংবা টেপ টেনিসে খেলে। আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপটে আমার কাছে মনে হয় তারা ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে। তারা বিশ্বাস করে সবাই বাউন্ডারি মারতে পারবে। আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের স্ট্রাইক রোটেশন কিংবা রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে উন্নতি করতে আমরা প্রচুর পরিশ্রম করেছি। এভাবেই তাদের তরুণরা বেড়ে উঠেছে। এটা ভুলতে পারবো না।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপসহ সম্প্রতি বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে অবনতি ঘটেছে। ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হচ্ছে। আপনার কি মনে হয় পাওয়ার হিটারের অভাব। পাওয়ার হিটিংয়ে সক্ষমতা বাড়াতে আপনার কি উপদেশ থাকবে?
ল্যান্স ক্লুজনার: আমি মনে করি এখানে একজন কোচ (পাওয়ার হিটিং কোচ) দরকার। বাংলাদেশের পাওয়ার হিটিং কোচ হতে আমি প্রস্তুত আছি। আমি মনে করি এটা একটা প্রক্রিয়া, যা খানিকটা সময় নেবে। আপনি দ্রুতই এখান থেকে ফলাফল পাবেন না। এজন্য কয়েকমাস আপনাকে কাজ করতে হবে। পাওয়ার হিটিং করার জন্য বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সক্ষমতা রয়েছে। পাওয়ার হিটিং বিষয়টি এমন নয় যে আপনি লং অফ এবং লং অন দিয়ে উড়িয়ে মারবেন। এখানে বিভিন্ন পাওয়ার জোন আছে। মুশফিকের কথাই ধরুন না, তার পাওয়ার হিটিংয়ের দারুণ সক্ষমতা রয়েছে। তার বিশেষ কিছু জায়গা রয়েছে। আপনি থিসারা পেরেরার (খুলনার ক্রিকেটার) কথাও বলতে পারেন। বাংলাদেশে এমন একজনকে দরকার যে ক্রিকেটারদের সমস্যাগুলো ধরতে পারবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারবে।
বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান যদি বেছে নিতে বলা হয় কাকে নেবেন আপনি?
ল্যান্স ক্লুজনার: সত্যিই বলতে তারা একেকজন একেকরকম। সাকিবের কথাই যদি বলি তাহলে সে মুশফিকের থেকে একেবারে ভিন্ন ধরনের ব্যাটসম্যান। সাকিব বিশ্বমানের অলরাউন্ডার। মুশফিকের আবার অন্য ধাঁচ, সে বিশ্বমানের উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান। কিছু জায়গায় তো কিছুটা ভিন্নতা রয়েছেই। আমি যেমন আগেই বলেছি যে সবার ভিন্ন ভিন্ন স্কোরিং জোন আছে। কোচের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের ওই জোনগুলো নিয়ে কাজ করা। অনেক সময় ক্রিকেটাররা নিজেদের শক্তির জায়গাকে অবহেলা করে। কিন্তু এমনটা হওয়া উচিত নয়। আমার মনে হয় নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো নিয়ে অনুশীলন করা উচিত। দুর্বলতা নিয়ে যতটা কাজ করা হয় শক্তির জায়গাগুলো নিয়েও ততটা কাজ করা দরকার। যদি একজনকে বাছাই করতে তাহলে অবশ্যই সেটা মুশফিক। সে বছরের পর বছর নিজেকে প্রমাণ করেছে। মুশফিক যেভাবে ব্যাটিং করে এবং মানসিক দৃঢ়তা দেখায় তাতে আমি তাকে এগিয়ে রাখবো। সে নিজের খেলা সম্পর্কে বেশ অবগত। সে কঠিন সময়ে ব্যাটিং সাবলীল করতে পারে। আপনি বিশ্বের বড় পাওয়ার হিটার হতে পারেন কিন্তু পরিস্থিতি না বুঝলে হবে না। কারণ আপনাকে বুঝতে হবে কখন মারতে হবে। আপনি যদি এই ব্যাপারগুলো নিয়ে না ভাবেন তাহলে কখনও ধারাবাহিক হতে পারবেন না।
দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট খেলেও বাংলাদেশের সাফল্য আসছে না। বিদেশের মাটিতে সেটি আরও বেশি খারাপ। যদিও নিউ জিল্যান্ডকে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ হারিয়েছে। কোথায় উন্নতি দরকার?
ল্যান্স ক্লুজনার: আমি মনে করি আপনি যখন নিউ জিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের মতো জায়গায় যাবেন তখন দেখবেন তাদের পেস বোলাররা কতটা মানসম্পন্ন। ওইগুলো স্পিন সহায়ক উইকেট নয়। আপনি দেখবেন বাংলাদেশের যে উইকেটগুলো হয় সেগুলো পেসারদের সহায়ক নয়। বাংলাদেশের আগের পেসাররা সুইং ও বাউন্স করতে পারতো। ওই ধরনের কন্ডিশনে আপনার পেস বোলারদের অবশ্যই ২০ কিংবা ১৬ উইকেট নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশের জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। রাসেল ডমিঙ্গোর অধীনে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ যে সফলতা পেয়ে তাতে আমি গর্বিত।
কিছুদিন পরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করবে বাংলাদেশ। সেখানে টেস্ট খেলতে হবে। সেখানে ভালো করার উপায় কি?
ল্যান্স ক্লুজনার: ক্রিকেট খেলার জন্য সেটা (দক্ষিণ আফ্রিকা) কঠিন জায়গা। আপনাকে অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছাড়া নিয়ে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে তাকালে দেখবেন যে অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছাড়াই সাফল্যের কারণ। এটা প্রমাণিত। স্লিপের দিকে বল ঠেলে দেয়া যাবে না। এটা করে বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে যেন সোজা বল করে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা লেগ সাইডে শক্তিশালী। আমার মনে হয় এশিয়ার দলগুলো অফ সাইডের বাইরের বল লেগ সাইডে টেনে খেলতে চায়। বোলিংয়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে একটি লাইন, লেংথে বল করতে হবে। বাংলাদেশে কিছু মানসম্পন্ন স্পিনার আছে। পরীক্ষা হবে যে বাংলাদেশের পেসাররা ১৬-২০ উইকেট নিতে পারে কিনা।
আপনি এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কোচিং করছেন। যেখানে কাজ করতে হয় নির্দিষ্ট কিছু সময়। কোনো দেশের হয়ে লম্বা সময় কাজ করার প্রস্তাব পেলে করতে চান কি না?
ল্যান্স ক্লুজনার: দুইটা জায়গায় দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ। আমি দুইটাই উপভোগ করি। তবে কোনো দেশের হয়ে কাজ করতে গেলে বেশি সময় পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে প্রতিভাবানদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকে। আপনি যখন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কাজ করবেন তখন বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করতে পারবেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কোচদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। আপনি স্কিল নিয়ে কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন না। দেশের ক্রিকেটে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং স্কিলেরও উন্নতি করতে হবে।
যদি বাংলাদেশ দলের কোচিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়…
ল্যান্স ক্লুজনার: হ্যাঁ, অবশ্যই। বাংলাদেশের কোচ হওয়ার প্রস্তাব পেলে সেটা ভালো লাগবে এবং সম্মানিত বোধ করবো। আমি মনে করি রাসেল ডমিঙ্গোর অধীনে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি ভালো জয় পেয়েছে। তার মতো একজনকে আমাদের সম্মান করা উচিত। আফগানিস্তান এবং জিম্বাবুয়ের হয়ে কাজ করার সময় আমি কিছু চ্যালেঞ্জর মুখে পড়েছি এবং সেগুলো আমি উপভোগও করেছি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের চেয়ে দেশের ক্রিকেটে কোচিং করানোর ক্ষেত্রে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম/রিয়াদ/ইয়াসিন